ভোটগ্রহণ ঘিরে নানা অনিয়ম-ষড়যন্ত্র ও ভোট কেনার চেষ্টার অভিযোগ তুলে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেযারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন স্থানে অর্থ লেনদেন, ভোটার প্রভাবিত করা এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে অনিয়মের নানা অভিযোগ সামনে আসছে, এসব ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি এসব কথা বলেন।
ভোটের আগে বিভিন্ন বিষয়ে দলের উদ্বেগ গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে নজরুল বলেন, “সৈয়দপুর বিমানবন্দরে এক জামায়াত নেতার কাছ থেকে প্রায় ৭৪ লাখ টাকা উদ্ধারের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দলের পক্ষ থেকে এটিকে ব্যবসার টাকা বলা হলেও গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, ওই ব্যক্তি ব্যবসায়ী নন। বরং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা দেওয়া আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তার বার্ষিক আয় মাত্র ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৮৬ টাকা এবং তিনি ন্যূনতম তিন হাজার টাকা কর দিয়েছেন।”
“এমন একজন ব্যক্তির কাছে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকা স্বাভাবিক নয় এবং বিষয়টি উদ্বেগজনক,” যোগ করেন তিনি।
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এই চেয়ারম্যান বলেন, “যারা নীতি ও সততার কথা বলেন, তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ উঠলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।”
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের সচিবকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে বলা হয়, বিপুল পরিমাণ অর্থ বহন করা অস্বাভাবিক নয়। পরে নির্বাচন কমিশনের সচিব ওই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্থ বিতরণ, ভোট কেনা ও নির্বাচনি অনিয়মের একাধিক ঘটনার তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, শরীয়তপুরে সাড়ে ১৬ লাখ টাকাসহ এক জামায়াত কর্মী আটক হয়ে দুই বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহীর একটি ভোটকেন্দ্রে ছয় জামায়াত কর্মীকে আটক করা হয়েছে। রাজধানীতেও ভোট কেনার অভিযোগে এক নেতাকে আটক করা হয়েছে।
অবশ্য রাইজিংবিডি ডটকমের প্রতিনিধির পাঠানোর খবর অনুযায়ী, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকাসহ এক জামায়াত কর্মী আটক হয়েছেন।
কুমিল্লা, পটুয়াখালী, নেত্রকোণা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় টাকা বিতরণ, হ্যান্ড বিলের আড়ালে ভোট কেনার চেষ্টা এবং অস্ত্রসহ জামায়াতের কর্মী আটকের অভিযোগ উঠেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করে নজরুল বলেন, এসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তার অভিযোগ, কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফরিদপুরের একটি ভোটকেন্দ্রে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে একটি দলের নেতাদের গোপন বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের একটি কেন্দ্রে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে একজন নেতাকে আটক করা হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়মের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে জানিয়ে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান বলেন, রাজধানীর কিছু এলাকায় প্রশিক্ষণবিহীন ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনি দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। পরে বিষয়টি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আনসার সদস্যদের মধ্যেও অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। নির্বাচন কমিশন এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতা দলের যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির গাড়িতে বিপুল অর্থ উদ্ধারের অভিযোগ প্রসঙ্গেও কথা বলেন।
নজরুল বলেন, গণমাধ্যমে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধারের উড়ো খবর প্রচার হলেও প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বৈধ সীমার মধ্যে অর্থ বহন করা হচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনি আইনে ভোটকেন্দ্রে জাল ভোটের অভিযোগ চ্যালেঞ্জ করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিতে হয়। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন কেন্দ্রে এজেন্টদের জন্য অর্থ রাখা হয়েছিল।
বিএনপি একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় জানিয়ে নজরুল বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি কাজ করছে। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায় দলটি।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মহল নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। কেউ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসুক তা চায় না, আবার কেউ নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান দুর্বল মনে করে নানা কৌশল অবলম্বন করছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে নজরুল বলেন, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ভোটের ফলাফল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে।
জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কাজ করবে তাদের দল।
জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে সব ধরনের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে এবং দেশ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সাক্ষী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন নজরুল।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, দলের মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী উপস্থিত ছিলেন।