সারা বাংলা

প্রথম ভোটে দেশজুড়ে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সকাল থেকে তরুণ ভোটারদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর জীবনে প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তাদের ঘিরে কেন্দ্রগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

এবার দেশের মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি তরুণ ভোটার। যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। তাদের অনেকে প্রথম ভোটার। আবার অনেকে আছেন এবার প্রথম ভোট দিচ্ছেন। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় তারা এর আগে ভোট দেননি। তারা সুষ্ঠু-সুন্দর পরিবেশে ভোট দিতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এবার ভোটাররা ভোট দিয়ে শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন না। একই সঙ্গে গণভোটে মতামত দিয়ে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে-বিপক্ষে তাদের মতামত দিবেন। একজন ভোট একই সঙ্গে দুটি ব্যালটে ভোট দিচ্ছেন। 

ফেনীতে তরুণ ভোটার প্রায় ৬ লাখ, যা জেলার মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশ। 

সকাল থেকে সরেজমিন দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ফেনীর বিভিন্ন কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তরুণ ভোটাররা। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ চলায় স্বস্তির কথা জানান তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক উপস্থিতিতেও সন্তোষ প্রকাশ করেন তরুণরা।

ফেনী আলিয়া মাদরাসা কেন্দ্রে ভোট দেওয়া জান্নাতুল নাঈম বলেন, ‘‘জীবনে প্রথমবার ভোট দিলাম। এই আনন্দ ভাষায় বোঝানো যাবে না। এমন সুশৃঙ্খল ভোটের পরিবেশের জন্যই তরুণরা জুলাইয়ে জীবন দিয়েছে।’’ তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতেও আর কারো ভোটাধিকার রুদ্ধ হবে না।  মনিকা নামে এক তরুণী ভোটার বলেন, ‘‘সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা শেষে প্রথমবার ভোট দিতে পেরেছি। এটি ভিন্নরকম অনুভূতি। জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে এমন প্রতিনিধিকেই আমরা সংসদে চাই।’’ 

ফেনী বিএড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেওয়া আরেক তরুণ ভোটার তানভীর আহমেদ। তিনি চান নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তরুণদের স্বপ্ন পূরণে কাজ করবেন। তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন পর মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারছে এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন। তরুণদের স্বপ্ন পূরণে কাজ করবে এমন নেতৃত্বই আমরা চাই।’’ 

লাইনে দাঁড়িয়ে তরুণেরা ভোট দিচ্ছেন।

 ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ফেনী জিএ একাডেমি কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা তরুণী ফাহমিদা নুর। তিনি বলেন, ‘‘একসময় ভোট বলতেই মারামারি, এক পক্ষ আরেক পক্ষ দৌড়াচ্ছে এমন চিত্র দেখতাম। অনেকে ভোট কেন্দ্রে এসে শুনতো তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে। এবার ঠিক তার উল্টো দেখলাম। মানুষজন সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন।’’  

প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশে জীবনের প্রথম ভোট দিয়েছেন ফেনীর শিক্ষার্থী মোনা রহিম। তিনি বলেন, ‘‘জীবনে প্রথম ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। অ্যাপস থেকে আগেই ভোটার সিরিয়াল জেনে এসেছি। ভোটারদের সুশৃঙ্খল লাইনে দাঁড়িয়েছি। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবো এটা আনন্দের।’’ 

ফেনী জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনীর তিনটি আসনে মোট ভোটার ১৩ লাখ ৩০ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬৭ জন, নারী ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৮ জন। জেলায় ৪২৮টি ভোটকেন্দ্র ও ২ হাজার ৪৩৯টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ চলছে।

এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনীর তিনটি আসনে মোট ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ফেনী-১ আসনে ৭ জন, ফেনী-২ আসনে ১১ জন এবং ফেনী-৩ আসনে ৮ জন প্রার্থী রয়েছেন।

সুষ্ঠু পরিবেশে ঝামেলা ছাড়া প্রথমবারের মতো ভোট দিয়ে উচ্ছ্বসিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের তরুণ ভোটারর। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের তরুণী সুমাইয়া সকালে বড় ভাইয়ের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের গ্রিন ভিউ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসে জীবনের প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। প্রথমবারের মতো দেশের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পেরে সুমাইয়ার চোখে-মুখে ছিল আনন্দের ঝিলিক।

ভোটদান শেষে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে সুমাইয়া বলেন, ‘‘আসলে ভোট দেওয়া নিয়ে গত রাত থেকে অনেক টেনশনে ছিলাম— কাকে ভোট দেব, কীভাবে ব্যালট পেপার ভাঁজ করব এই বিষয়গুলো নিয়ে। কেন্দ্রে আসার পর ভেতরে গিয়ে দেখলাম দায়িত্বরত কর্মকর্তারা খুব সুন্দরভাবে সব বুঝিয়ে দিলেন। এরপর আল্লাহর রহমতে একটি প্রতীকে আমার জীবনের প্রথম ভোটটি দিলাম।’’ 

উচ্ছ্বসিত এই নতুন ভোটার আরো জানান, দেশের নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরে তিনি গর্বিত।

জীবনের প্রথম ভোট দিচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুমাইয়া

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ভোটারদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে। সুমাইয়ার মতো হাজারো তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। 

 জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে নয়টি রাজনৈতিক দলের ১৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখন পর্যন্ত ভোটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক।

ফজরের নামাজের পর থেকে গাজীপুরে ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে শুরু করেন। অনেক কেন্দ্রে নারী ও পুরুষ ভোটারদের লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। 

সাগর নামে এক তরুণ ভোটার বলেন, “জীবনে এই প্রথম আমি ভোট দিলাম। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। পরিবেশ খুব সুন্দর, আমরা এমন পরিবেশই চেয়েছিলাম।”

গাজীপুর জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে মোট ৪২ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল থেকে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে অনেক ভোটার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রামে জীবনের প্রথম ভোট দিলেন নুসরাত জাহান রুহি। মাকে সঙ্গে নিয়ে নগরীর জামাল খান ডা. খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন তিনি। তার মাও এই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন।

  মাকে নিয়ে জীবনের প্রথম ভোট দিতে এসেছেন নুসরাত জাহান রুহি।

মা ও মেয়ে দুই জনই এই স্কুলেরই ছাত্রী।  ভোট দিয়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে নুসরাত জাহান রুহি বলেন, ‘‘ভোটের পরিস্থিতি অত্যন্ত সুন্দর, শান্তিপূর্ণ। এভাবে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।’’ 

তারা দুইজনই কামনা করেছেন দেশে শান্তি ফিরে আসুক। একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসুক।  ভোট অত্যন্ত সুন্দর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানান তারা।