রাজনীতি

প্রত্যাবর্তনের নেতার হাতে বাংলাদেশ

সংকটকালে দলের হাল ধরে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের বন্দরে পৌঁছে বিএনপিকে শুধু পুনর্বার  ক্ষমতায় বসাচ্ছেন না, রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান নিজের প্রত্যাবর্তন ঘটালেন নজিরবিহীন ইতিহাস গড়ে। রক্তঝরা জুলাই অভ্যুত্থান, নতুন রাজনৈতিক পটভূমি, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণে টালমাটাল পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক উত্তরণের বার্তা দিয়ে ১৮ কোটি মানুষকে সাথে নিয়ে অগ্রগামী বাংলাদেশের নেতা হিসেবে আবিভূত হলেন তিনি। তার হাতেই উঠছে দেশের ভবিষ্যৎ দিশা নির্ধারণের দায়িত্ব। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটিতেই জয় পাওয়া বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রমাণ হলেও দলকেও এনে দিয়েছেন কাঙ্ক্ষিত বিজয়। তার দলের এককভাবে সরকার গঠন এখন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষা মাত্র। তিনি হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। 

শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি এককভাবে ১৫৭ আসন নিশ্চিত করেছে। এ আসন সংখ্যা পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এলে আরো বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাছাড়া, ঘোষিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ও সমমনারা মিলে এখন পর্যন্ত ১৫৮ আসন নিশ্চিত করেছে। অপরদিকে, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। 

নির্বাসিত জীবন ও দেশে ফেরা ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। সে সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর ২০২৪ সালের আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তন আসে। 

সরকার পতনের কয়েক মাস পর গত বছরের ডিসেম্বরে বড়দিনের সময় দেশে ফেরেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার সময় তাকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক বীরোচিত সংবর্ধনা জানান। তার এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে বলে মনে করেন দলের নেতারা।

রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার বহন করছেন। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিএনপিকে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত করেন।

অন্যদিকে, তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেন। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্ব এখনও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে চলেছে।

নির্বাচনি প্রচার ও রাজনৈতিক বার্তা নির্বাচনি প্রচারণার শেষ দিনে মা-বাবার কবর জিয়ারত করে প্রচার কার্যক্রমের ইতি টানেন তারেক রহমান। এই ঘটনাকে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রতীকী ও আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নির্বাচনি অঙ্গীকার হিসেবে তারেক রহমান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানান, কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চান তিনি।

বক্তব্যে প্রতিশোধের রাজনীতির বিরোধিতা করে তিনি বলেন, “প্রতিশোধ কারো জীবনে ভালো কিছু বয়ে আনে না। প্রতিশোধের কারণে অনেক মানুষকে দেশ ছাড়তে হয়, যা কোনো দেশের জন্য ইতিবাচক নয়। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।”

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনে বিজয়ী হলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সম্ভাব্য নেতৃত্বের অবস্থানে উঠে আসা তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রাকে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।