বিনোদন

ফাগুন এলেই মনে পড়ে হুমায়ুন ফরীদি

ফাগুন মানেই রং। ফাগুন মানেই প্রেম, উৎসব, নতুন পাতার হাসি। কিন্তু বাংলাদেশের নাটক-চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে ফাগুন মানেই বিষাদের আরেক নামও। কারণ, এই ফাগুনেই পরপারে পাড়ি জমান দাপুটে অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। 

যে মানুষটি অভিনয় করতেন না, যেন চরিত্রের ভেতর ঢুকে নিজেই চরিত্র হয়ে উঠতেন। কণ্ঠের ভারী উচ্চারণ, চোখের তীক্ষ্ণতা আর উপস্থিতির শক্তি একসঙ্গে মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। 

তিনি নেই, কিন্তু তার অভিনয় রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তার সংলাপ, তার হাঁটার ভঙ্গি, তার চোখের ভাষা। রয়ে গেছে মানুষের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা—যেখানে শুধু একটি নামই বারবার ফিরে আসে, হুমায়ুন ফরীদি। 

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর সব মায়া কাটিয়ে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর এত বছর পরও দর্শকের মনে তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং জীবন্ত এক ইতিহাস। 

আশি ও নব্বইয়ের দশকে মঞ্চ, টিভি নাটক আর চলচ্চিত্রে যে ক’জন শিল্পী ছিলেন দর্শকের হৃদয়ের একেবারে শীর্ষে, হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম নয়—অনেকের কাছে তিনি ছিলেন এক নম্বর। তার অভিনয়ে ছিল এক ধরনের দাপুটে সহজতা।  

১৯৫২ সালের ২৯ মে, ঢাকার নারিন্দায় জন্ম তার। বাবা এটিএম নুরুল ইসলাম, মা বেগম ফরিদা ইসলাম। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। স্কুলজীবনে ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। 

১৯৭০ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে—অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে। 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে খাতা-কলম এক পাশে রেখে কাঁধে তুলে নেন রাইফেল। টগবগে তরুণ ফরীদি যুদ্ধের মাঠে দাঁড়িয়ে যান এক দামাল সন্তানের মতো। দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। স্বাধীনতার পর তিনি ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। আর এখানেই যেন দ্বিতীয়বার তার প্রকৃত জন্ম হয়—একজন শিল্পী হিসেবে। 

অর্থনীতির ছাত্র হয়েও তিনি নাট্যতত্ত্বে দীক্ষা নেন নাট্যকার সেলিম আল দীনের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে। ছাত্র সংসদের নাট্য সম্পাদক ছিলেন তিনি। 

জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের সেই সব বিকেল, নাটকের রিহার্সাল, কণ্ঠের অনুশীলন, চরিত্রের ভেতরে ঢোকার লড়াই—এসবই একদিন তৈরি করে দেয় ভবিষ্যতের হুমায়ুন ফরীদি। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নাট্যেৎসবে সবার নজর কাড়েন। তখনই মানুষ বুঝে গিয়েছিল, এই ছেলেটা আলাদা। 

হুমায়ুন ফরীদির অভিনয়জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্ত ভিত ছিল মঞ্চ। ঢাকা থিয়েটারের ব্যানারে তিনি অভিনয় করেন ‘শকুন্তলা’, ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘কীর্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’-এর মতো নাটকে। 

মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে টিভি নাটকে এসে হুমায়ুন ফরীদি যেন নতুন এক অধ্যায় লিখলেন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘নীল নকশার সন্ধ্যায়’ ও ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় জায়গাটা তিনি করে নেন ধারাবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’ দিয়ে। কানকাটা রমজান—একটি চরিত্র, যা আজও দর্শকের মনে রয়ে গেছে। 

তার অভিনীত জনপ্রিয় নাটকের সংখ্যা অসংখ্য। এ তালিকায় রয়েছে—‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কতদূর’, ‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘মহুয়ার মন’, ‘সাত আসমানের সিঁড়ি’, ‘একদিন হঠাৎ’, ‘অযাত্রা’, ‘পাথর সময়’, ‘দুই ভাই’, ‘শীতের পাখি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘তিনি একজন’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মোহনা’, ‘শৃঙ্খল’, ‘প্রিয়জন নিবাস’ প্রভৃতি।  

তার এমন অসংখ্য কাজ, যেগুলো তাকে পরিণত করেছে সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী অভিনেতায়। জীবনের শেষদিকে তিনি ‘তখন হেমন্ত’ নামে একটি ধারাবাহিক নাটক পরিচালনা করেন এবং ‘পূর্ণ চাঁদের অপূর্ণতায়’ নাটকে অভিনয় করেন। 

বাংলা চলচ্চিত্রে খলচরিত্র একসময় ছিল একধরনের একঘেয়ে ফর্মুলা। কিন্তু হুমায়ুন ফরীদি এসে সেটাকে ভেঙে দিলেন। খল চরিত্রে এনে দিলেন মানুষ। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘হুলিয়া’। আর প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘সন্ত্রাস’। এই ‘সন্ত্রাস’ দিয়েই মূলত তিনি চলচ্চিত্রে খলনায়ক হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামলছায়া’, ‘একাত্তরের যীশু’, ‘মায়ের মর্যাদা’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘পালাবি কোথায়’ প্রভৃতি। 

২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। তবে পুরস্কার না পেলেও তার অভিনয় ছিল এমনই, যা পুরস্কারের চেয়েও বড়—মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যাওয়ার পুরস্কার। 

হুমায়ুন ফরীদি ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান। তিনি ছিলেন মঞ্চের সন্তান, টেলিভিশনের রাজপুত্র, আর চলচ্চিত্রের ভয়ংকর অথচ মানবিক খলনায়ক।