নির্বাচনের পর সরকার গঠন করবে কোন দল? উত্তরটা সবারই জানা, যে দল বা জোট বিজয়ী হবে বা সবচেয়ে বেশি সংসদীয় আসন পাবে তারাই গঠন করবে সরকার। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জন করেছে, অর্থাৎ ১৫০টি আসনের বেশি পেয়েছে।
তবে নতুন সরকার গঠন হবে কিভাবে বা তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে চলছে আলোচনা। সংবিধান অনুযায়ী, এই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বা নতুন সরকার গঠনের শুরুটা হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ঠাকুরগাঁওয়ের তাতীপাড়াস্থ নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের সরকার গঠন করা হবে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কবে সরকার গঠন করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) বলেই দিয়েছে ১৫ তারিখের মধ্যে গঠন করতে হবে।’’
শপথ কত দিনের মধ্যে নিতে হয়: সাধারণত নিবাচনের ফল ঘোষণার তিনদিনের মধ্যে শপথ পড়ানো হয়। কিন্তু এখানে একটা কথা আছে। সাধারণভাবে নির্বাচন কমিশন থেকে যে বেসরকারি ফল যাওয়া যায় এক বা দু’দিনের মধ্যে, সেটা কিন্তু আনুষ্ঠানিক ফলাফল হিসেবে গণ্য হয় না। মানে সেই ফলাফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে শপথ নিতে হবে এমনটা নয়।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলাফল ‘সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত’ হতে হবে এবং এরপর ‘তিন দিনের মধ্যে’ নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ হবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর প্রজ্ঞাপন হতে আরো কয়েকটা দিন বাড়তি সময় লাগতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গণমাধ্যকে ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, তার মতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে না।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এক ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত সময়ে (ক্ষমতা) হস্তান্তর হবে। ... এটা তিন দিনের মধ্যে হয়ে যেতে পারে। ১৫, ১৬ ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে। আমার মনে হয় না এটি ১৭, ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে।’ সেক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে সব ঠিক থাকলে নির্বাচনের পরে ছয় দিনের মধ্যেই নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
নির্বাচিত সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন শপথ কে পড়াবেন এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ নিয়ম অনুযায়ী অতীতে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন মূলত জাতীয় সংসদের স্পিকার। কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতে সংসদ নেই, স্পিকারও নেই। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে।
তাহলে উপায় কী আছে? এক্ষেত্রে আবারো যেতে হবে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে। যেখানে বলা হয়েছে, ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি যে কোনো কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’
এই অনুচ্ছেদে মূলত দুটি উপায় বলা হয়েছে। এক. রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করানোর জন্য কাউকে মনোনীতি করতে পারেন। দুই. যদি তিন দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ করাতে না পারেন তাহলে তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাবেন।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত ৫ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন। সে সময় তিনি জানান, নির্বাচনের পর দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, “এটা সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। আমাদের সামনে দুটি অপশন আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করা পারেন। উদাহরণ হিসেবে হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। আর এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই।”