সারা বাংলা

১৭ বছর পর বগুড়ায় ‘ঘাঁটি’ পুনরুদ্ধার করল বিএনপি

একসময় বহুল উচ্চারিত ছিল, ‘বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি’। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের রাজনীতিতে সেই কথাটি যেন অনেকটাই চাপা পড়ে গিয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার ৭টি আসনেই বিপুল ব্যবধানে বিএনপির জয় সেই পুরোনো পরিচয়কে আবারো স্বগর্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছিলেন, বগুড়ার ৭টি আসনই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে চান নেতাকর্মীরা। তবে তা হবে জনগণের সমর্থন নিয়েই। সে লক্ষ্যেই তৃণমূল থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করেছেন, সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রেজাউল করিম বাদশা বলেন, “বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। এখানকার মানুষ আগেও আমাদের সমর্থন করেছেন, এবারো করেছেন। তাই আমরা ৭টি আসন আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে পেরেছি।”

বগুড়া জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় মোট ভোটার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৪০ জন। ৭টি আসনে ভোট দিয়েছেন ২১ লাখ ২৪ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে বৈধ ভোট গণনা হয়েছে ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৮২৩টি। বিএনপি পেয়েছে ১৩ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত পেয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার ১৩১ ভোট। মোট বৈধ ভোটের হিসাবে বিএনপি পেয়েছে ৬৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং জামায়াত পেয়েছে ৩৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট।

জয়ের পর বগুড়ার সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, এ বিজয় জেলার জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর বগুড়া উন্নয়নবঞ্চিত ছিল বলে অভিযোগ তাদের। এবার উন্নয়নের গতি ফিরবে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ আরো এগিয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা তাদের।

অনেকে আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তারা। তাদের মতে, তিনি একজন যোগ্য নেতা এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বে আরো মর্যাদার আসনে পৌঁছাবে।

ভোটের পরিবেশ নিয়েও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন ভোটাররা। দীর্ঘদিন পর তারা শান্তিপূর্ণ ও নির্ভয় পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন বলে জানান। অনেকের কাছে দিনটি ছিল ঈদের দিনের মতো আনন্দঘন।

তবে প্রত্যাশার তালিকাও কম নয়। ভোটারদের প্রধান দাবি কর্মসংস্থান সৃষ্টি। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব দূর করা, রাস্তাঘাট ও স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং দরিদ্র মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

বগুড়ার প্রবীণ সাংবাদিক সবুর শাহ লোটাস বলেন, “সারাদেশে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের ধারায় বগুড়া আবারো প্রমাণ করেছে, এটি শহীদ জিয়ার গড়া দলের শক্ত ঘাঁটি।”

তিনি উল্লেখ করেন, বগুড়া-৬ আসন থেকে তারেক রহমান সর্বোচ্চ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রত্যাশা, তিনি এ আসনটি রাখবেন। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া এ আসন রেখে যে উন্নয়নের ধারা শুরু করেছিলেন, ২০০৬ সালের পর তা থেমে যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, “বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, জেলাকে বিভাগ বা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা, রেলপথে যমুনা সেতুর সরাসরি সংযোগ, বিমানবন্দর চালু ও ইপিজেডের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবন, এসবই বগুড়াবাসীর ন্যায্য দাবি।” পাশাপাশি বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জেলাকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু বলেন, “১৭ বছর বগুড়ার মানুষ বঞ্চিত ছিল। এখন আমরা চাই, দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক বগুড়া।”

তিনি আরো বলেন, “সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সারা দেশে উন্নয়ন বাস্তবায়ন হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা। মানুষ একটি নিরাপদ, সুখী ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী বাংলাদেশ চায়, যে দেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।”

সবশেষে জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, “নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। বিমানবন্দর চালু, সিটি কর্পোরেশন ও বিভাগ ঘোষণা, রেললাইন উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সচলকরণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

অন্যদিকে, ৭টি আসনের কোনোটিতেই জয় পায়নি জামায়াত। পরাজয়ের কারণ জানতে যোগাযোগ করা হলে বগুড়া শহর জামায়াতের সেক্রেটারি আ স ম আব্দুল মালেক তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, পরবর্তীতে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।