ত্রয়োদশ জাতীয় সংবাদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয়লাভ করার পর, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে কিনা তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি ফিরতে যাওয়ার ঘটনায় ভারত যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, তা বেশ সমঝদার ও উষ্ণতাপূর্ণ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বাংলায় পোস্ট করা একটি বার্তায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্রতিবেশীর জন্য ভারতের সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় আরো জানান, ভারত-বাংলাদেশ বহুমুখী সম্পর্ক জোরদার করতে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বার্তার সুর ছিল ইতিবাচক ও সতর্ক। ২০২৪ সালে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং উভয় পক্ষেই অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে। এই নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি।
‘স্বৈরাচার’ হয়ে ওঠা শেখ হাসিনাকে ভারত সমর্থন দেওয়ায় অনেক বাংলাদেশি দিল্লির ওপর ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত হত্যা, পানি বিরোধ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং উস্কানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরোনো সব অভিযোগ। বর্তমানে ভিসা পরিষেবা অনেকাংশে স্থগিত, আন্তঃসীমান্ত ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে বিমান চলাচলও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি পুনঃসূচনা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও পারস্পরিক সদিচ্ছা।
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক স্টাডিজের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, “নির্বাচনি ময়দানে থাকা দলগুলোর মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থি হিসেবে ভারতের জন্য আগামী দিনে সবচেয়ে নিরাপদ বাজি। তবে প্রশ্ন থেকে যায়: তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন? তিনি স্পষ্টতই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন। কিন্তু এটি বলা যত সহজ, করা ততটা নয়।”
দিল্লির কাছে বিএনপি কোনো অজানা শক্তি নয়
তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০১ সালে বিএনপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল, তখন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটেছিল। বিএনপি-জামায়াত আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল অস্থিরতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা।
যদিও তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্রই প্রথম বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস ছিল খুবই নড়বড়ে। বিএনপি যেভাবে ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, তা দিল্লির মনে এই সন্দেহ জাগিয়েছিল যে, ঢাকা কৌশলগতভাবে ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
শিগগিরই ভারতের দুটি ‘রেড লাইন’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে: উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের সমর্থন বন্ধ করা এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ভোলা ও যশোরের মতো জেলাগুলোতে হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনা দিল্লিকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল ২০০৪ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনায়। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের বৃহত্তম অস্ত্রের চালান, যা কথিতভাবে ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য পাঠানো হচ্ছিল। অর্থনৈতিক সম্পর্কও খুব একটা ভালো ছিল না। টাটা গ্রুপের প্রস্তাবিত ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ গ্যাস নিয়ে দরাদরির কারণে থমকে যায় এবং ২০০৮ সালে তা ভেস্তে যায়।
সম্পর্কের অবনতি চলতেই থাকে। ২০১৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া নিরাপত্তা উদ্বেগের অজুহাতে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেন, যা দিল্লির কাছে একটি বড় অপমান হিসেবে গণ্য হয়েছিল।
সেই অস্বস্তিকর ইতিহাসই ব্যাখ্যা করে যে, কেন ভারত পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের দিকে এত বেশি ঝুঁকে পড়েছিল।
ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৫ বছরে শেখ হাসিনা দিল্লিকে সেই নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়েছেন যা ভারত তার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে: বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং এমন একটি সরকার যা চীনের চেয়ে ভারতের প্রতি বেশি অনুগত। এই অংশীদারিত্ব ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে যতটা লাভজনক ছিল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হাসিনার জন্য তা ততটাই চড়া মূল্যের ছিল।
বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের নিরাপত্তা অভিযানের কারণে দেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। জাতিসংঘ বলছে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের অনীহা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের পুনঃসূচনাকে আরো জটিল করে তুলেছে।
গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বিএনপির প্রয়াত চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা সফর করেন এবং সেই সুযোগে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তারেক রহমান ঘোষণা করেন, “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়- সবকিছুর আগে বাংলাদেশ”, যা দিল্লি ও ইসলামাবাদের প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকার ইঙ্গিত দেয়।
দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান একটি স্পর্শকাতর বিষয়
বিবিসি প্রতিবেদন অনুসারে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সম্পর্ক মেরামত করতে সময় নষ্ট করেনি। ১৪ বছর পর গত মাসে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। এর আগে ১৩ বছরের মধ্যে প্রথম কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সফর বিনিময় করেছেন, দেশ দুটির নিরাপত্তা সহযোগিতা আবারো আলোচনার টেবিলে এবং ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বেড়েছে। এর অর্থ খুবই স্পষ্ট- একসময়ের শীতল সম্পর্ক এখন উষ্ণ হচ্ছে।
দিল্লির আইডিএসএ-এর স্মৃতি পট্টনায়েক বিবিসিকে বলেন, “বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে- তাতে আমাদের উদ্বেগের কিছু নেই, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের সেই অধিকার আছে। অস্বাভাবিক ছিল হাসিনার আমলে প্রায় কোনো যোগাযোগ না থাকা। পেন্ডুলাম একদিকে খুব বেশি ঝুলে গিয়েছিল; এখন ঝুঁকি হলো এটি অন্য দিকে খুব বেশি ঝুলে যাওয়ার।”
ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পুনঃসূচনায় সম্ভাব্য একটি গুরুতর বাধা
পট্টনায়েকের মতে, “বিএনপিকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যে হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কম। একই সাথে, ঢাকার বিরোধী দলগুলো সরকারকে চাপ দিতে থাকবে ভারতের কাছে তাকে ফেরত চাওয়ার জন্য- বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এটি তাদের হাতে থাকা অল্প কয়েকটি হাতিয়ারের একটি। কিন্তু এটি সহজ হবে না।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বিবিসিকে বলেন, “দিল্লি যদি তার মাটি থেকে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করে, তাহলে তা হবে বিপজ্জনক। নির্বাসনে থাকা অবস্থায় হাসিনার প্রাক-নির্বাচনি সংবাদ সম্মেলনগুলো ছিল বিস্ময়কর। তিনি যদি দুঃখ প্রকাশ না করেন বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের পথ করে না দেন, তাহলে তার উপস্থিতি সম্পর্ককে আরো জটিল করবে।”
এরপর রয়েছে আন্তঃসীমান্ত বাকযুদ্ধ- ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং টেলিভিশন স্টুডিওগুলোর উস্কানিমূলক মন্তব্য বাংলাদেশে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করেছে যে, দিল্লি বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম দেশ না ভেবে তাদের নিজেদের আজ্ঞাবহ আঙিনা মনে করে।
সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক স্টাডিজের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতি নির্ভর করবে ঢাকা এই ভারত-বিরোধী মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না এবং দিল্লি তার আক্রমণাত্মক বার্তা কমিয়ে আনতে পারে কি না তার ওপর। যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তবে নিরাপত্তা সহযোগিতা এই অস্থির সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশ প্রতি বছর সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ টহল এবং প্রতিরক্ষা বৈঠক পরিচালনা করে।
পট্টনায়েক বলেন, “আমি মনে করি না বিএনপি এই সহযোগিতা কমিয়ে দেবে। বাংলাদেশের নেতৃত্বে এখন একজন নতুন নেতা, একটি ভিন্ন জোট ও ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসা একটি দল।”
বিবিসি বলছে, সম্পর্কে এত অস্থিরতা সত্ত্বেও ভৌগলিক অবস্থান ও অর্থনীতি- বাংলাদেশ ও ভারতকে একত্রে বেঁধে রেখেছে। দুই দেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের সীমান্ত, গভীর নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার।
সম্পর্কের ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে একটি সফল পুনঃসূচনা জরুরি
অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, “বিএনপির সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ক অবিশ্বাসের চেয়েও বেশি জটিল। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমান যে পরিপক্কতা দেখিয়েছেন এবং দিল্লি যে বাস্তবসম্মত আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তা আশাব্যঞ্জক।”
এখন প্রশ্ন হলো, প্রথম পদক্ষেপ কে নেবে।
অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, “বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। বাংলাদেশের মানুষ একটি বলিষ্ঠ নির্বাচন করেছে; এখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে, দেখতে হবে আমরা কোথায় সাহায্য করতে পারি। আমি আশাবাদী যে বিএনপি অতীতের শিক্ষা গ্রহণ করেছে।”
অন্য কথায়, সম্পর্কের পুনঃসূচনা এখন বক্তৃতার চেয়েও বেশি নির্ভর করছে ভারত সতর্কতার বদলে সাহসিকতাকে বেছে নেয় কি না তার ওপর।