সারা বাংলা

পাবনা-৩: ঘোড়া ‌‘খেয়েছে’ ধানের শীষ, ফসল উঠল জামায়াতের পাল্লায়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবশেষে বহুল আলোচিত পাবনা-৩ আসনে ‘ঘোড়ায় খেয়ে গেছে’ ধানের শীষ। আর তাতে বিজয়ের ফসল উঠেছে দাঁড়িপাল্লায়। এই ফলাফল পাবনা-৩ আসনের নির্বাচনি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়ে। এবারই প্রথম  নির্বাচিত হয়ে সংসদে যাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী।

ফলাফল ঘোষণার পর থেকে পাবনা-৩ আসন নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে তা রকেট সায়েন্স নয়। আগে থেকেই এমন আভাস ছিল। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল এবং ভোটার, বিজয়ী-পরাজিত প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, 

বিএনপির ধানের শীষের হেভিওয়েট প্রার্থী কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের পরাজয়ের পথ তৈরি করেছিলেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য কে এম আনোয়ারুল ইসলাম।

রাইজিংবিডি ডটকম ভোটের আগে ‌‘পাবনা-৩: বিদ্রোহীর ঘোড়ায় ধানের শীষ ‘খেলে’ দাঁড়িপাল্লার হবে পোয়াবারো’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে পাবনা-৩ আসনের ত্রিমুখী নির্বাচনি লড়াইয়ে হার-জিতের পূর্বভাস দিয়েছিল।

ওই প্রতিবেদনে আসনটির ভোটারদের মতামতে উঠে এসেছিল, ধানের শীষের প্রার্থী তুহিনের বিরুদ্ধে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে বিদ্রোহী হওয়া বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা আনোয়ার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের ভোট কাটাকাটি হলে রেসে টিকতে পারবেন না দুজনের কেউ; ফাঁক গলে নজিরবিহীন ফল করবে দাঁড়িপাল্লা। শেষমেষ হলোও তাই। এখন মাঠ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে ভোটের সেই ফলাফল স্বচ্ছ আয়নার মতো চোখের সামনে ভেসে উঠবে।

চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর- এই তিন উপজেলা গঠিত পাবনা-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৪। মোট ভোটকেন্দ্র ১৭৭টি। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ জন, ভাঙ্গুড়ায় ১ লাখ ৭ হাজার ৭১১ এবং ফরিদপুরে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯১। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আট প্রার্থী।

বেসরকারি ফলাফলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আলী আছগার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ধানের শীষের হাসান জাফির তুহিন পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ২০৬ ভোট। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) আনোয়ারুল ইসলাম ঘোড়া প্রতীকে পেয়েছেন ৩৮ হাজার ২৭ ভোট। অন্য পাঁচ প্রার্থী মিলে পেয়েছেন ৫ হাজার ৪২০ ভোট।

তুহিনের চেয়ে ৩ হাজার ২৬৯ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আছগার। আনোয়ারের সঙ্গে ১ লাখ ৯ হাজার ৪৪৮ ভোটের ব্যবধান গড়েছেন আছগার। আর ঘোড়ার চেয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ১৭৯ ভোট বেশি পেয়েছে ধানের শীষ।

এই আসনে মোট ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৮১১টি। বাতিল ভোটের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৮৩টি। ভোট পড়ার হার ৭০ দশমিক ২২। বাতিল ভোটের অর্ধেকও যদি ধানের শীষ পেত, তাহলে ফসল উঠতো বিএনপির গোলায়।

আরেকটি হিসাবও সামনে আসছে। উপজেলাভিত্তিক প্রাপ্ত ভোট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাটমোহরে ধানের শীষ পেয়েছে ৭৭ হাজার ১০০ ভোট, দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৬২ হাজার ৭২০ ভোট, আর স্থানীয় প্রার্থীর ঘোড়া পেয়েছে ৩১ হাজার ৬৪৭ ভোট। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে ৪৪ হাজার ২১২ ভোট, ধানের শীষ পেয়েছে ২৮ হাজার ৬০৩ এবং ঘোড়া পেয়েছে ৪ হাজার ৫৯৫ ভোট। ফরিদপুর উপজেলায় দাঁড়িপাল্লা ৩৮ হাজার ৯০৫, ধানের শীষ ৩৭ হাজার ৮৩৭ এবং ঘোড়া ১ হাজার ৬১০ ভোট।

ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, চাটমোহরে দাঁড়িপাল্লার চেয়ে ধানের শীষ ১৩ হাজার ৩৮০ ভোট বেশি পেয়েছে। ভাঙ্গুড়ায় আবার ধানের শীষের চেয়ে ১৫ হাজার ৬০৯ ভোট বেশি পেয়েছে দাঁড়িপাল্লা। ফরিদপুর উপজেলায় ধানের শীষের চেয়ে ১ হাজার ৬৮ ভোট বেশি পেয়েছে দাঁড়িপাল্লা।

ভাঙ্গুড়ার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ভাঙ্গুড়ায় সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। একইসাথে ফরিদপুর উপজেলায় ধানের শীষ জেতার কথা থাকলেও সেখানেও দাঁড়িপাল্লা সামান্য ব্যবধানে বেশি ভোট পেয়েছে। আর চাটমোহরে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েও ধানের শীষের প্রার্থী অন্য দুই উপজেলায় হেরে যাওয়ায় পরাজিত হয়েছেন। 

তিন উপজেলার প্রতিটিতে দেখা যাচ্ছে, ঘোড়া প্রতীক ভোট কেটেছে ধানের শীষের। যদিও রেসেই টিকতেই পারেনি ঘোড়ায় চড়া আনোয়ার। অথচ শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে তার বিজয়ীর হওয়ার আভাস ছিল। আর যাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয় হওয়ার ধারণা করেছিলেন ভোটাররা; সেই দাঁড়িপাল্লার আছগার হয়ে গেলেন প্রথম। 

ঘোড়ায় চড়া আনোয়ারের বাড়ি চাটমোহরে হওয়ার সুবাদে তিনি অন্তত চাটমোহর থেকে ৮০ হাজার ভোট পাবেন বলে ধারণা করেছিলেন সবাই। ফরিদপুরে হারলেও ভাঙ্গুড়া উপজেলায় দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করার কথা ছিল ঘোড়ার। কিন্তু তার কিছুই করতে পারেননি তিনি।

প্রার্থী ও নেতাকর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু জানা গেছে, ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয়ের প্রধান কারণ বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার। বিদ্রোহী না থাকলে অনায়াসে ধানের শীষের তুহিন বিজয়ী হতেন। দ্বিতীয় কারণ, তার দলের কিছু নেতা নির্বাচনের খরচের টাকা নিয়ে ঠিকমতো কাজ করেননি। অর্থাৎ কিছু নেতা বেইমানি করেছেন। তৃতীয় কারণ, প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সভাপতি ও তারেক রহমানের বন্ধু হওয়ায় তার আত্মঅহংকার ছিল বলে অনেকে মনে করেন। চতুর্থ কারণ, দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে নেতাকর্মীরা ছিলেন বিভক্ত।

বিএনপির বিদ্রোহী আনোয়ারের পরাজিত হওয়ার বেশ কিছু কারণ নির্বাচনি এলাকায় কথা বলে জানা গেছে। এক. তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। দুই. জনপ্রিয়তা থাকলেও টাকার অভাবে তিনি মাঠ ও নেতাকর্মী ধরে রাখতে পারনেনি। তিন. বিএনপির বড় অংশের ভোট ধানের শীষের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে চলে যাওয়ায় পিছিয়ে ছিলেন তিনি। চার. ‘স্থানীয় প্রার্থীকে এমপি চাই’- এমন হাইপ তুলে শেষ পর্যন্ত সেটি ধরে রাখতে পারেননি। সাধারণ মানুষের কাছে আন্দোলনটি নিয়ে যেতে পারেননি। পাঁচ. প্রতিপক্ষের প্রার্থীর কর্মীরা তার বিরুদ্ধে অনলাইনে লাগাতার বিভিন্ন অপপ্রচার করেছেন এবং তার নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকি সঙ্গে মারধর করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা নিজ উপজেলা চাটমোহরে তার যে পরিমাণ ভোট পাওয়ার কথা তার অর্ধেক ভোটও পাননি।

প্রথমত, বিএনপির এই গ্রুপিং দাঁড়িপাল্লার আছগারকে তার বিজয়ের পথকে সহজ করে দিয়েছে। অর্থাৎ ঘোড়ার সামান্য চালে মাত হয়ে গেছে ধানের শীষ। আর তাতেই কপাল খুলেছে দাঁড়িপাল্লার। দ্বিতীয়ত, নারী ভোটারের একটি বড় অংশের ভোট পড়েছে দাঁড়িপাল্লায়। তৃতীয়ত, নিজ উপজেলা ভাঙ্গুড়ার মানুষ তাকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। যে ভোট ব্যবধান গড়ে দিয়েছে জয়ের ক্ষেত্র। ভাঙ্গুড়ায় যে পরিমাণ বেশি ভোট দাঁড়িপাল্লা পেয়েছে, সেই ভোট অন্য দুই উপজেলা মিলিয়েও কাভার করতে পারেননি ধানের শীষের প্রার্থী।

ধানের শীষের তুহিনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চাটমোহর উপজেলার সদস্য সচিব চাটমোহর পৌর বিএনপির সভাপতি আসাদুজ্জামান আরশেদ বলেন, “ফরিদপুর উপজেলায় বিএনপি সবসময় জিতে এসেছে। এবারও জিতবে সেই আশা ছিল। কিন্তু সেখানে কীভাবে জামায়াত জিতল, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। আর বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে ভোটের ফলাফলে একটু প্রভাব পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।”

বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলামের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট চাটমোহর উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সাবেক সদস্য সচিব হাসাদুল ইসলাম হীরা বলেন, “আমাদের ঘোড়া প্রতীকের পরাজয়ের প্রধান কারণ ধানের শীষের লোকজন লাগাতারভাবে অপপ্রচার চালিয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে। শেষের তিন দিনে তারা মাত্রা ছাড়া অপপ্রচার চালিয়েছে। সাধারণ মানুষও সেটি বিশ্বাস করেছে। আর একটি কারণ হলো, আওয়ামী লীগের ভোটের একটি বড় অংশ দাঁড়িপাল্লায় চলে গেছে।”

নিজের পরাজয়ের পেছনে কারণ হিসেবে বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটের প্রভাব মানতে নারাজ বিএনপির তুহিন। তিনি বলেন, “যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন, তিনি তার মতো করে ভোট করেছেন। তাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তোষজনক ছিল না। আর ভোট কারচুপি করেছে জামায়াত এবং ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা তাদের লোকজন। এ জন্য আমি ফলাফল পুনর্গণনার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছি।”

বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “আশা করেছিলাম চাটমোহরবাসীর ভোটেই আমি জয়ের পথে অনেক দূর এগিয়ে থাকব। তা ছাড়া শুরু থেকেই আমাদের বিভিন্নভাবে বাধা দিয়েছে প্রতিপক্ষের লোাজজন, অপপ্রচার চালিয়েছে। আশানুরূপ ভোট পাইনি। যে কারণে জিততে পারিনি। তবে সবার প্রতি ভালোবাসা আর শুভ কামনা রইল।”

বিজয়ী জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আলী আছগার বলেন, ধানের শীষ আর ঘোড়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝে আমি বেরিয়ে গেছি এটা কিছুটা ঠিক। তবে যতুটুকু বুঝেছি মানুষ পরিবর্তন চায়। নতুন কাউকে চায়। সেক্ষেত্রে আমি এগিয়ে গেছি। আর সম্মান দেওয়ার মালিক আল্লাহ। তিনি চেয়েছেন আর আমরা চেষ্টা করেছি।”