রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক উত্তরণকালের নির্বাচনি ইশতোহারে সবার জন্য অর্থনীতির সুযোগ করে দিতে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছে বিএনপি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে এগিয়ে যাওয়া তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের ‘অর্থনীতির প্রাণভোমরা’ পুঁজিবাজার আরো গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব হবে- এমন প্রত্যাশা বিনিয়োগকারী ও বাজার-সংশ্লিষ্টদের।
বছরের পর বছর টালমাটাল থাকা পুঁজিবাজার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার দিন বন্ধ থাকার পর খুলেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মার্কেট। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) দারুণ লেনদেন শুরু হয়েছে। গতিহীনতা কাটিয়ে গতিতে ফেরা শুরু করেছে বাজার।
এদিন শুরু থেকেই উভয় পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২০০.৭২ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে।
রবিবার ডিএসইতে মোট ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭৯০ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট। পুরোনো অস্থিরতা কাটিয়ে এই পরিসংখ্যানকে স্থিতিশীলতার নবযাত্রা বলা যায়।
এদিন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই আগের দিনের চেয়ে ৪৮৪.৩৭ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১৫ হাজার ৫১৮ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
এর আগে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রথম কার্যদিবস (৬ আগস্ট) ডিএসইর ডিএসইএক্স সূচক ১৯৭.১৫ পয়েন্ট এবং সিএসইর সিএএসপিআই সূচক ৪৬৭.১০ পয়েন্ট ছিল।
সংসদ নির্বাচন হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে ব্যাপক চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থার উন্নতি হয়েছে। ফলে নতুন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ছে। জাতীয় নির্বাচন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা— এই দুই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে গতি ফিরতে শুরু করেছে। নির্বাচিত সরকার গঠনের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে এবং গতি আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও বাজার-সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, দীর্ঘসময় পর দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর পুঁজিবাজার পরিস্থিতি আরো স্থিতিশীল হবে- এমন আশায় বিনিয়োগকারীরা আবার পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন। নির্বাচনের আগের দুই সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের দাবি, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ভঙ্গুর আর্থিক খাত পুনর্গঠনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে। এতে জনগণের আস্থা ফিরবে এবং বিনিয়োগে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। নতুন মন্ত্রিসভায় আর্থিক খাতে দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যোগ্য অর্থমন্ত্রী, পুঁজিবাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞ অর্থ প্রতিমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান নিয়োগকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
ঐক্য পরিষদের চাওয়া, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সমন্বিত উদ্যোগে বহুজাতিক ও লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো বাজারে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া দেশের আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করে জাতীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ।
রূপান্তরের এই সময়ে পুঁজিবাজার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিনের সঙ্গে কথা বলেছে রাইজিংবিডি ডটকম।
তিনি বলেন, “বিএনপির নির্বাচনি ইশতোহারে পুঁজিবাজার নিয়ে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা ছিল। দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে। সেদিক বিবেচনায় বলা যায়, বিএনপির নবগঠিত সরকার পুঁজিবাজারবান্ধব হবে।”
পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করতে আগের সব সরকার বহু প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত দিনকে দিন অন্তঃসারশূন্য হতে থাকে সংস্থাটি। অন্তর্বর্তী সরকারও নানা উদ্যোগ নিয়েও তেমন কিছু করে দেখাতে পারেনি।
অবশ্য ধুকতে থাকা পুঁজিবাজারের ঘুরে দাঁড়াবার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে অধ্যাপক আল-আমিন বলছেন, “নির্বাচনের আগে থেকেই অনেক বিনিয়োগকারী আবার বিনিয়োগে ফিরেছেন। আবার অনেকেই নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগ করবেন বলে অপক্ষোয় আছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে মনে করছি, নির্বাচন-পরবর্তী পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে।”
“নির্বাচনকে ঘিরে গত দুই সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেনে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু নির্বাচন হয়েছে, তাই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে ফিরবেন বলে ধারণা করা যাচ্ছে। অনেকেই ধারণা করছেন, নির্বাচিত সরকার এলে পুাঁজবাজারে একটা মোমেনটাম ঘটবে। তাই অনেকেই বিনিয়োগ করে রাখছেন,” বলছেন অধ্যাপক আল-আমিন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমরা নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিষয় ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। সেসময় তিনি জানিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে পুঁজিবাজারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।”
তিনি বলছেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যেহেতু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হয়েছে, সেহেতু আশা করা যায় বিএনপির হাত ধরেই পুঁজিবাজার আরো গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব হবে।”
“দেশের ইতিহাসে এই প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পুঁজিবাজারকে নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের ইশতেহারের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক গতিশীলতা আরো ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করছি,” বলছেন সাইফুল ইসলাম।