এমন না যে শ্রীলঙ্কা আগে অস্ট্রেলিয়াকে কখনো হারায়নি, হারিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই হারিয়েছে। সেটা অবশ্য ১৭ বছর আগে নটিংহ্যামে। লম্বা সময় পর, সোমবার পাল্লেকেল্লেতে শ্রীলঙ্কা অস্ট্রেলিয়াকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হারাল। কিন্তু লঙ্কানদের এমন রূপ আগে কখনো দেখেনি তারা।
প্রথমে বোলিংয়ে, পরে ব্যাটিংয়ে। শ্রীলঙ্কার দাপটে স্রেফ বিধ্বস্ত অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের আমন্ত্রণে ব্যাটিংয়ে নেমে অস্ট্রেলিয়া ১৮১ রানে গুটিয়ে যায়। শ্রীলঙ্কা ১৮ ওভারে লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে ৮ উইকেট হাতে রেখে। সেটাও পাথুম নিশাঙ্কার বিস্ফোরক সেঞ্চুরিতে। এবারের আসরের প্রথম সেঞ্চুরি আসল নিশাঙ্কার ব্যাটে। ৫২ বলে ১০ চার ও ৫ ছক্কায় মাঠ মাতিয়ে সেঞ্চুরি তুলে নেন নিশাঙ্কা।
অস্ট্রেলিয়ার শুরুর ব্যাটিংয়ের সঙ্গে শেষের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রথম ১০ ওভারে তাদের রান ছিল ২ উইকেটে ১১০। সেখান থেকে শেষ ১০ ওভারে ৭১ রান তুলতে ৮ উইকেট হারায় তারা। তাতেই সবশেষ। ম্যাচটাও হেরে যায় তালগোল পাকানো ব্যাটিংয়ে।
পরে নিশাঙ্কা ঝড়ে স্রেফ উড়ে যায় তারা। ডানহাতি ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি হবে কি না তা নিয়ে জল্পনাকল্পনা ছড়াচ্ছিল। রোমাঞ্চ দোলা দিচ্ছিল। নখ কামড়ানো মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল।
২৪ বলে শ্রীলঙ্কার জয়ের জন্য দরকার ছিল ৩১ রান। পেসার নাথান এলিসের করা ওভার থেকে নিশাঙ্কা একাই তুলে নেন ১৬ রান। তার ব্যক্তিগত স্কোর পৌঁছায় ৮৯ রানে। দলের রান ১৬৯। সেঞ্চুরিতে পৌঁছতে দরকার ১১ রান। শ্রীলঙ্কার জয়ের জন্য ১৩ রান।
আগ্রাসী ব্যাটিং করতে থাকা নিশাঙ্কার তর সইছিল না! জাম্পাকে পরের ওভারের প্রথম বল সুইপ করে ৪ হাঁকান। এক বল পর আবার বাউন্ডারি। চতুর্থ বল লং অনে পাঠিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নেন ২ রান। এবার কেবল ১ রানের অপেক্ষা। পঞ্চম বলে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে আসে। ডিপ মিড উইকেটে বল পাঠিয়ে নিশাঙ্কা তুলে নেন এই ফরম্যাটে তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।
পাল্লেকেলেতে তখন গগণবিদারী চিৎকার। জয়ের জন্য লঙ্কানদের লাগত ২ রান। অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যান রাতনায়েকে ওই ওভারের শেষ বলে চার মেরে দলকে দুর্দান্ত এক জয় এনে দেন। নিশাঙ্কার সেঞ্চুরি, দলের অভূতপূর্ব জয়। লঙ্কানদের আর কী চাই?
ঘরের মাঠে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করার রেকর্ড গড়ে শ্রীলঙ্কা তুলে নিল টুর্নামেন্টের তৃতীয় জয়। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ও টুর্নামেন্টেও এটি তাদের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড।
বৈশ্বিক টুর্নামেন্টেও তাদের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বড় জয়। ১৯৯৬ ওয়ানডে বিশ্বকাপে লাহোরে শ্রীলঙ্কা জিতেছিল ৭ উইকেটে। ২০০৯ সালে নটিংহ্যামে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জয় এসেছিল ৬ উইকেটে। এবার ৮ উইকেটে।
এই জয়ে তাদের সুপার এইটও নিশ্চিত হয়ে গেল। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া জিম্বাবুয়ের কাছে হারের পর শ্রীলঙ্কার কাছেও হারল। তাদের সুপার এইট অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। আগামীকাল জিম্বাবুয়ে আয়ারল্যান্ডকে হারালে অস্ট্রেলিয়ার বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাবে।
টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে মিচেল মার্শ ও ট্রেভিস হেডের ঝড়ে ৮.২ ওভারে ১০০ রান পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। পাওয়ার প্লে’তে তুলে ৭০ রান। স্পিনার থিকসানার করা ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে মার্শ ৫টি চার হাঁকান। হেড ও মার্শের ঝড়ে মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ার রান দুইশ পেরিয়ে যাবে।
কিন্তু উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর এলোমেলো হতে থাকে তাদের ব্যাটিং অর্ডার। ২৯ বলে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় ৫৬ রান করে হেড আউট হন হেমান্তার বলে। তার দেখানো পথ হেঁটে মার্শ আউট হন ২৭ বলে ৫৪ রান করে। ৮ চারের সঙ্গে ২টি ছক্কা মারেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক। মাঝে ক্যামেরুন গ্রিন ৭ বলে ৩ রান করে দুনিথ ওয়েলাগের শিকার হন।
এরপর যত বড় নাম এসেছে ক্রিজে, প্রত্যেকেই হতাশ করে ফিরেছেন। টিম ডেভিড (৬), জস ইংলিশ (২৭), গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (২২), মার্কস স্টয়নিস (৪) দ্রুত সাজঘরে ফেরেন।
টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি মাত্র চতুর্থ ঘটনা, যেখানে ১০০ রানের বেশি উদ্বোধনী জুটির পর কোন দল অলআউট হয়েছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন ঘটনা এবারই প্রথম দেখা গেল। এছাড়া পূর্ণ সদস্যভুক্ত কোনো দলের ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে ২০২৪ সালে মিরপুরে বাংলাদেশ ১০১/০ থেকে ১৪৩ রানে অলআউট হয়েছিল জিম্বাবুয়ে-এর বিপক্ষে।
শ্রীলঙ্কার ব্যাটিংয়ের শুরুটা যুৎসই হয়নি। কুশল পেরেরা ৩ বলে ১ রান করে স্টয়নিসের বলে আউট হন। এরপর তাদেরকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় উইকেটে ৯৭ রান যোগ করেন নিশাঙ্কা ও কুশল মেন্ডিস। পাল্লা দিয়ে দুজন ব্যাটিং করেন ২২ গজে। কোন বোলারকেই দেখাননি সম্মান।
৩৮ বলে ৬ চার ও ১ ছক্কায় ৫১ রান করে কুশল বিদায় নিলেও শ্রীলঙ্কার জয় পেতে সমস্যা হয়নি। নিশাঙ্কা অপরপ্রান্তে দৃষ্টিনন্দন চার-ছক্কায় মাঠ মাতিয়ে যান। ৩২ বলে ফিফটি ছোঁয়ার পর পরের ২০ বলে সেঞ্চুরিতে পৌঁছে যান এই ব্যাটসম্যান।
পুরো ইনিংসটিই ছিল পিকচার পারফেক্ট। এছাড়া ফিল্ডিংয়ে ‘বাজপাখি’ হয়ে ধরেছেন একটি ক্যাচ। দিনটা আজ শুধু তারই ছিল। এমন দিনে অস্ট্রেলিয়াকে ধাক্কা দিলেন নিশাঙ্কা যেদিন তাদের বিশ্বকাপ ভাগ্য পেণ্ডলামে ঝুলে গেল।