ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় কিছু বোঝাপড়া হয়েছে, ঠিক তখনই খামেনি এই আলোচনা নিয়ে নেতিবাচক সুর চড়িয়েছেন। খবর আল-জাজিরার।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ৮৬ বছর বয়সী খামেনি বলেন, ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হবে ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা’। এর পরিপ্রেক্ষিতে খামেনেই বলেন, “এটি একটি ভালো স্বীকারোক্তি। কিন্তু আপনারা এটি করতে পারবেন না।”
তিনি বলেন, ইরান আমেরিকার মতো ‘দুর্নীতিবাজ নেতাদের’ কাছে মাথানত করবে না।
খামেনি আরো বলেন, “তারা বলে আমাদের সঙ্গে পরমাণু শক্তি নিয়ে আলোচনা করো, আর সেই আলোচনার ফলাফল হতে হবে এমন যে তোমাদের এই শক্তি থাকা চলবে না।” তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ‘শূন্য’ পর্যায়ে নামিয়ে আনার মতো কোনো ‘মূর্খতাপূর্ণ’ শর্তে আলোচনা সম্ভব নয়।
খামেনির এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগেই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, “এর আগের তুলনায় এবার খুব গুরুত্ব সহকারে আলোচনা হয়েছে এবং আমরা কিছু গঠনমূলক মতবিনিময় করেছি। আমরা কিছু নীতিমালার বিষয়ে একমত হয়েছি এবং ভবিষ্যতে একটি খসড়া নথি তৈরি করব।”
ওমান মধ্যস্থতা করছে এই আলোচনায়। উভয় পক্ষই মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির কাছে তাদের মতামত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের মূল লক্ষ্য হলো ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা প্রত্যাহার।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পক্ষই আলোচনা ভালো হয়েছে বলে জানালেও চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে বড় ধরনের বাধা রয়েছে। ওয়াশিংটন জেদ ধরে আছে, ইরানের ভেতরে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলবে না। এছাড়া ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করতে হবে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে হবে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে আমেরিকা।
ইরান এই দাবিগুলোকে তাদের ‘রেড লাইন’ অতিক্রম হিসেবে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবর্তে, ইরান প্রস্তাব দিয়েছে, তারা ইউরেনিয়াম কর্মসূচি সীমিত করবে করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সুযোগ দেবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ আল-জাজিরাকে বলেন, “এই আলোচনাগুলো এত দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া থেকে আশাবাদী হওয়া কঠিন। যেখানে ২০১৫ সালের চুক্তিতে আড়াই বছর সময় লেগেছিল, সেখানে এত বড় ব্যবধান কমানো সহজ নয়।”
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কথার লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের পরিস্থিতিও উত্তপ্ত। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কাছে আরো একটি যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর জবাবে খামেনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের কাছে এমন অস্ত্র আছে যা মার্কিন রণতরী ‘ডুবিয়ে’ দিতে পারে। মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়া চালিয়েছে।
আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, নির্দেশ পেলে তারা বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত। মঙ্গলবার মহড়ার সময় কয়েক ঘণ্টার জন্য এই রুটটি বন্ধ রাখা হয়েছিল।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি রসুল সেরদারের মতে, দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে সামরিক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।