পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ফল ও ইফতার সামগ্রীর বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সরেজমিনে বাদামতলী ফলের পাইকারি বাজার ও চকবাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের ফল, খেজুর ও ইফতার সামগ্রীর দাম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্ক কাঠামোর চাপ, ডলার সংকট এবং সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর ফল ও খেজুরের ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি পড়েছে।
বাদামতলী ফলের পাইকারি বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রমজান মাস ঘিরে বিভিন্ন ফলের দামে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। এখানে আনার বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি, আপেল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, গ্রীণ আপেল ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, কমলা ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা, আঙুর ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, কালো আঙুর ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাল্টা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পেয়ারা ৮০ থেকে ১২০ টাকা, আনারস হালি প্রতি ৬০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাদামতলীর বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের ম্যানেজার মোহিত আনসারী বলেন, “আমদানি শুল্ক ও কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া বেড়েছে। পরিবহন খরচও বেশি। সব মিলিয়ে ফলের দামে প্রভাব পড়ছে।”
পাইকারি বাজারে ফল কিনতে আসা খুচরা ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, “বেশি দামে কিনছি, তাই খুচরাতেও দাম কমানো যাচ্ছে না। বিক্রি আগের মতো নেই।”
পরিবারের জন্য ফল কিনতে আসা আজিজুর রহমান বলেন, “রমজানে ফলের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু দামও বেড়ে যায়। বেশিরভাগ ফল মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।”
ফলের দাম বৃদ্ধির জন্য সরকারের সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধিকে দুষছেন অনেক ব্যবসায়ী। তারা বলছেন, আমদানি করা তাজা ফলের ওপর সম্পূরক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। শুল্ক হারের কারণে দেশের বাজারে ফলের দাম বেড়েছে। সাধারণ ভোক্তাদের ওপর যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, “দেশে চাহিদার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ফল আমদানি করতে হয়। আমদানিনির্ভর এই বাজারে ব্যবসায়ীরা সাধারণত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করেন। বর্তমানে ব্যাংকের উচ্চ সুদহার, বাড়তি মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।”
তিনি জানান, এসব কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক পরিমাণ ফল আমদানি হচ্ছে, যা রমজানের বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে। রোজায় ইফতারে ফলের চাহিদা বেশি থাকায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে শুল্ক কর কমানোর দাবি জানান তিনি। আমদানি ব্যয় কমানো গেলে সরবরাহ বাড়বে এবং ভোক্তারা সহনীয় দামে ফল কিনতে পারবেন।
খেজুরের পাইকারী বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় বিভিন্ন প্রকার ও মানের খেজুরের দাম প্রতিকেজি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজার মাশরুফ খেজুর বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৬০০ টাকা, মেজ্জুল ১১০০ থেকে ১৪০০ টাকা, মরিয়ম ১১০০ টাকা, আজোয়া ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, কালমী ৮৫০ টাকা, সাধারণ খেজুর ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাহাত ড্রাই ফুড লি.-এর স্বত্বাধিকারী মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে দাম বেশি, সরকার শুল্ক সুবিধা দিলেও আগে থেকে আমদানি করা পণ্য বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।”
এদিকে, রমজান উপলক্ষে ইফতার সামগ্রী ও নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বেড়েছে কয়েকটি পণ্যের। রাজধানীর চকবাজার ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ছোলা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা, ডাবলি ৬০ টাকা, এংকার ডাল ৬০ টাকা, বেসন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, খেসারী ডাল ৬০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৫ টাকা, বেসন ১২০ টাকা, পেঁয়াজ ৬০ টাকা, আদা ১৫০ টাকা, রসুন ২২০ টাকা, বেগুন ১২০ টাকা ও লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা।
নিত্যপণ্য ব্যবসায়ী রমিজ এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী আবদুল মালেক বলেন, “নিত্য পণ্যের তুলনামূলকভাবে দাম বেশি বাড়েনি। রমজানের আগের চেয়ে কিছুপণ্যে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে।”
রমজানের সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, “এই মাসকে কেন্দ্র করে বাজার ব্যবস্থাপনা শুধু সরবরাহ ও চাহিদার বিষয় নয়, এটি সুশাসন ও তদারকিরও বিষয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা, আমদানি প্রক্রিয়া সহজ রাখা এবং বাজারে কার্যকর মনিটরিং জোরদার করা হলে অস্থিরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে অসাধু মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, যাতে ভোক্তারা স্বস্তিতে কেনাকাটা করতে পারেন।”