রোজা ইসলামের অন্যতম ফরজ বিধান। কোরআনের বর্ণনা অনুসারে এটা শুধু মুসলমানের জন্য ফরজ করা হয়নি, বরং পূর্ববর্তী উম্মতের জন্যও রোজা ফরজ ছিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
ইসলামী শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো, ফরজ ইবাদত পালনের জন্য জরুরি জ্ঞান অর্জন করাও ফরজ। তাই আসুন রোজার জরুরি বিধানগুলো জেনে নেই।
চাঁদ দেখার বিধান
সামষ্টিকভাবে মুসলিম সমাজের জন্য রমজান মাসের চাঁদ অনুসন্ধান করা ওয়াজিব। যদি একদল মানুষ চাঁদ অনুসন্ধান করে তবে অন্যরা দায়মুক্ত হয়ে যাবে। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে এবং চাঁদ দেখা না যায় তবে শাবান মাসকে ৩০ দিন গণনা করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখবে এবং চাঁদ দেখে রোজা শেষ করবে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় যদি চাঁদ তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয় তবে শাবান মাসকে ৩০ দিন পূর্ণ করবে।’ (মারাকিল ফালাহ, পৃষ্ঠা ৫৫)
ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রমজানের চাঁদ অনুসন্ধান করা মুস্তাহাব। কেননা নবীজি (সা.) শাবান মাসের হিসাব রাখতেন এবং রমজানের চাঁদ অনুসন্ধান করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের খুব হিসাব করতেন। এ ছাড়া অন্য কোনো মাসের এত হিসাব করতেন না। এরপর রমজানের চাঁদ দেখে রোজা রাখতেন। আকাশ মেঘলা থাকার কারণে চাঁদ দেখা না গেলে শাবান মাস ৩০ দিনে গণনা করতেন, অতঃপর রোজা রাখতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৩২৫)
যাদের ওপর রোজা ফরজ
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে ব্যক্তির ভেতর তিনটি শর্ত পাওয়া গেলে তার ওপর রোজা ফরজ হয়। তা হলো: ১. মুসলিম হওয়া ২. সাবালক হওয়া ৩. আকিল তথা সজ্ঞানে থাকা, উন্মাদ বা পাগল না হওয়া। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ১/৩০৩)
রোজা আদায়ের শর্ত
নিম্নোক্ত শর্তগুলো কোনো ব্যক্তির ভেতর পাওয়া গেলে তার জন্য রমজান মাসে রোজা আদায় করা ওয়াজিব। শর্তগুলো হচ্ছে : ১. রোগমুক্ত থাকা ২. মুকিম তথা মুসাফির না হওয়া ৩. হায়েজ না থাকা ৪. নিফাস না থাকা। হায়েজ ও নিফাসের জন্য রোজা ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি থাকলেও পরবর্তীতে তা কাজা আদায় করতে হয়। (আল-ফিকহুল ইসলামী ও আদিল্লাতুহু, রোজা অধ্যায়)
রোজার নিয়ত
রোজার রোকন বা মূলভিত্তি দুটি, যা ছাড়া রোজার অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তা হলো: ১. নিয়ত: বেশির ভাগ ফকিহের মতে, রমজানের রোজার নিয়ত করা আবশ্যক। যেন নিয়তের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তথা ইবাদতের উদ্দেশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকছে। হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ফজরের আগে রাত থাকতে রোজার নিয়ত করল না তার রোজা গ্রহণযোগ্য নয়।’ (মুসনাদে আহমদ) তবে ‘আমি আল্লাহর জন্য রোজা রাখছি’ এ কথা মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়; বরং রোজা রাখার জন্য শেষ রাতে ওঠা এবং সাহরি খাওয়াই যথষ্টে।
২. সংযম: আল্লাহ রোজাদারের জন্য যেসব কাজ নিষদ্ধি করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং সংযম প্রদর্শন করা। সাহরির শেষ সময় থেকে সূর্যাস্তের পর পর্যন্ত খাওয়া, পান করা, স্ত্রী-সঙ্গম ইত্যাদি পরিহার করা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা পানাহার কোরো যতক্ষণ রাতের কৃষ্ঞরেখা থেকে উষার শুভ্র রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের কাছে প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত আসার আগ পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
ইফতার ও সাহরির বিধান
রোজা রাখার জন্য সাহরি খাওয়া সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহরি খেতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সাহরি খাও। কেননা সাহরির মধ্যে বরকত নিহিত আছে।’ (বেহেশতি জেওর : ৩/১৫)
সাহরি রাতের যে কোনোভাগে খাওয়া যায়। তবে সাহরি খাওয়ার উত্তম সময় হলো শেষ রাত। সাহরি বিলম্বে খাওয়া সুন্নত। কিন্তু সন্দেহের সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা মাকরুহ। অনেকের ধারণা আজান দেওয়ার আগ পর্যন্ত খাওয়া যায়। এটা ভুল। সুবহে সাদিক হয়ে গেলে সাহরির সময় শেষ হয়ে যায়, চাই আজান হোক বা না হোক, কেউ যদি রোজার নিয়ত করে ফেলে এবং সাহরির সময় অবশষ্টি থাকে, তবে তার জন্য শেষ সময় পর্যন্ত পানাহার করা জায়েজ। ক্ষুধা না থাকলেও সামান্য পরিমাণ কিছু খেলেও সাহরির ফজিলত পাওয়া যাবে। কোনো কারণে সাহরি খেতে না পারলেও রোজা রাখা আবশ্যক।
ইফতারের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা উত্তম। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয় সেই বান্দা যারা বিলম্ব না করে ইফতার করে।’ (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ১/৩১১)
মাগরিবের নামাজের আগে ইফতার করা উত্তম। তবে ইফতারের জন্য মাগরিবের নামাজে খুব বেশি বিলম্ব করা অনুচিত। বিলম্বে ইফতার করা মাকরুহ। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিলম্ব করার অবকাশ আছে।
ইফতারের দোয়া
ইফতারের সময় এই দোয়া পড়া উত্তম : ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার জন্য আমি রোজা রেখেছি এবং আপনার রিজিক দ্বারা ইফতার করছি। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২৩৫১)
খেজুর দ্বারা ইফতার করা উত্তম। খেজুর না থাকলে মিষ্টি জাতীয় খাবার দ্বারা ইফতার করা, তাও না থাকলে পানি বা অন্য কিছু দিয়ে ইফতার করা। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ১/৩১২)
হে আল্লাহ! আমাদের যথাযথভাবে রোজা রাখার তাওফিক দিন। আমিন।