অসম্পূর্ণতা আমরা কেউই সম্পূর্ণ নই। একটা পাখির ডানা সম্পূর্ণ, একটা নদীর বাঁক সম্পূর্ণ, কুয়াশামাখা একটা সকাল সম্পূর্ণ। একটা শ্বাস সম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ একটা অপেক্ষা। কিন্তু আমরা শুরু থেকেই অসম্পূর্ণ। আমাদের চিন্তায় ফাঁক, সাহসে ফাঁক, বিশ্বাসে, ভালোবাসায় ফাঁক। আমরা জানি কীভাবে কাঁদতে হয়, জানি না কীভাবে হাসতে হয়, আর জানি না কীভাবে প্রাপ্য বেঁচে থাকাটায় বাঁচতে হয়। প্রতিদিন নিজের সঙ্গে প্রতারণা করি। ভুল সিদ্ধান্তকে সাহস বলি, ভুল সম্পর্ককে ভাগ্য বলি, আর দুঃখকে জীবন বলি। আমরা অচেনা আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজ পরিচয় খুঁজি এবং প্রতিবার ভুল মানুষ হয়ে ফিরে আসি। শেষ পর্যন্ত বুঝি— অসম্পূর্ণতাই আমাদের সবচেয়ে বড় সত্য, কারণ এই ছাড়া আমরা আর কিছু নই। *** মানুষ তবে কি আমি নীল নদের জল মেপে দেখেছিলাম? নইলে এতবার ডুবে গিয়েও ভেসে উঠি কীভাবে? আকাশের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে শিখে নিয়েছি ঝড়ের সঙ্গে বোঝাপড়া। সে আমাকে মুছে দেবে না— একথা বিশ্বাস করতাম কুকুরের মতো। একদিন ঝড় সরে গেলে দেখলাম, একই ওজনে হালকাই আছি। দিনরাত মস্তিষ্কে ঠোকরায় কাঠঠোকরা— থেমো না, থেমো না। হোঁচট খাওয়া আর উঠে দাঁড়ানো বাক্যে হাত ঘষেছি অজস্রবার। অভ্যাসের নেশায় এমন জড়িয়ে গেলাম— ভাঙা আয়নাতেই নিজেকে খুঁজতাম। মুখ কাটত, তবু চোখ সরাতাম না; বরং রক্ত দেখলে নিজের অস্তিত্ব টের পেতাম। একদিন সাহস করে জুতো কিনলাম— খালি পায়ে পথ বড় বিশ্বাসঘাতক। পাথরেরও স্মৃতি থাকে, হিসেব রাখে কতবার মরেছি। সেদিন আকাশ ভারী ছিল, মেঘ জমেছিল কালো হয়ে— জানতাম, ঝড় উঠবে। না, দরজা বন্ধ করিনি। পালাইওনি। ঝোড়ো কাক হয়ে বুঝলাম, সব আশ্রয় ঘর নয়; কিছু ঝড় আসে মানুষ বানাতে। ***
আমিই সমুদ্র
চায়ের মগ হাতে দাঁড়িয়ে আছি মগের ভেতর গরমটা ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে, আর সমুদ্র— সে শান্ত হতে জানে না। মুহুর্মুহু গর্জায়, যেন প্রতিটি ঢেউ আলাদা আলাদা বাক্য, যা ঠিকঠাক অনুবাদ করতে পারেনি কেউ। চায়ে চুমুক দিই। নোনতা হাওয়ায় চায়ের স্বাদ বদলে যায়। এই বদলে যাওয়াটাই জীবন— যা আমরা ধরতে পারি না, কেবল সময় গ্যালারিতে জমা থাকে। সমুদ্র আমাকে কিছু বলে না, তবু যেন অনেক কিছু বলে। আমার ভেতরের জমে থাকা শব্দগুলো ঢেউয়ের ভাঙনে ভেঙে ভেঙে যায়, ফেনার মতো পলকা হয়ে উড়ে যায় দূরে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়— আমি কোনো মানুষ নই; আমি একটা শূন্য মগ, যার ভেতর ওই গর্জন ঢুকে পড়ে আর নিঃশব্দে উপচে যায়। চায়ের শেষ উষ্ণতা হাতের তালু ছেড়ে গেলে সমুদ্র তখনও স্বকীয় থাকে— অবিচল, অটল— আমার মতোই, কিছু বলতে না পেরে চিরকাল গর্জনরত।