সাতসতেরো

রমজানে রোজা না রাখার ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামী শরিয়ত মুসলমানের জন্য রমজান মাসের রোজাকে ফরজ করেছে। তাই মুসলমানের জন্য রোজা রাখা অপরিহার্য দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

রোজা শুধু ফরজ ইবাদতই নয়, বরং তা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘পাঁচটি জিনিসের ওপর ইসলামের বুনিয়াদ রাখা হয়েছে, সাক্ষ্য দেওয়া আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, আল্লাহর ঘরের হজ করা এবং রমজানের রোজা রাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮)

শরিয়তের ভাষ্য অনুযায়ী বিশেষ অপারগতা ছাড়া কোনো ফরজ ইবাদত ছেড়ে দেওয়া হারাম এবং কবিরা গুনাহ। তাই রমজানের মাসে রোজা না রাখাও কবিরা গুনাহ ও হারাম কাজ। হাদিসে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা না রাখার ভয়াবহ শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছে। আবু উমামা বাহিলি (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এ সময় দুই মানুষ এসে আমার দুই বাহু ধরে আমাকে দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে গেল। সেখানে নিয়ে তারা আমাকে বলল, পাহাড়ে উঠুন। আমি বললাম, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তারা বলল, আমরা আপনার জন্য সহজ করে দিচ্ছি। তাদের আশ্বাস পেয়ে আমি উঠতে লাগলাম এবং পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত গেলাম।

সেখানে প্রচণ্ড চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কিসের শব্দ? তারা বলল, এটা জাহান্নামিদের চিৎকার। এরপর তারা আমাকে এমন কিছু লোকের কাছে নিয়ে গেল যাদের পায়ের টাকনুতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের গাল ছিন্নভিন্ন এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তারা বলল, এরা হচ্ছে এমন রোজাদার যারা রোজা পূর্ণ করার আগে ইফতার করত।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৭৪৯১)

হাদিসে রোজা ত্যাগ করাকে কুফরি সদৃশ বলা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইসলামের হাতল ও দ্বিনের মূল বিষয় তিনটি; যার ওপর ইসলামের ভিত্তি। যে ব্যক্তি তার একটি ত্যাগ করল, সে এমন অবিশ্বাসীতে পরিণত হলো, যার রক্তপাত বৈধ। সেগুলো হচ্ছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই বলে সাক্ষ্য দেওয়া, ফরজ নামাজ ও রমজানের রোজা।’ (মাজমাউল জাওয়াইদ : ১/৪৮)

কিন্তু কেউ যদি অপারগ হয়ে রোজা ত্যাগ করে তবে আল্লাহর দরবারে তার কোনো জবাবদিহি নেই। যেমন কেউ অসুস্থতা, অতি বার্ধক্য বা সফরে থাকার কারণে রোজা রাখতে না পারলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। সুস্থতা ও শক্তি লাভের পর এবং ঘরে ফেরার পর তার কাজা আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে। কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

যারা ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগ করে, তারা এমন সাওয়াব ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়, যার কোনো প্রকৃত প্রতিবিধান নেই। কোনো কিছুর বিনিময়ে ছুটে যাওয়ার রোজার ফজিলত লাভ করা সম্ভব নয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি প্রয়োজন ও রোগ ছাড়া রমজানের একটি রোজা ভেঙ্গে ফেলল, তার সারা জীবনের রোজা দ্বারাও এ কাজা আদায় হবে না, যদিও সে সারাজীবন রোজা পালন করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭২৩)

তবে ছুটে যাওয়া রোজার কাজা ও কাফফারা ব্যক্তিকে পাপমুক্ত হতে সাহায্য করে। আলেমরা বলেন, কেউ রোজা ছেড়ে দেওয়ার পর যদি আল্লাহর দরবারে তাওবা করে এবং কাজা ও কাফফারা আদায় করে, আশা করা যায় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। ফকিহ আলেমরা বলেন, ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগ করে তবুও তার প্রতিবিধান আছে। এই প্রতিবিধান তার পাপমুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। তবে তা রোজা রাখার ফজিলত ফিরিয়ে দিতে পারে না।

প্রতিটি মুসলমানের উচিত, যথাযথভাবে রোজা রাখার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে রোজা রাখার তাওফিক চাওয়া। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা হলো, ‘যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও নিষ্ঠার সঙ্গে রমজানের রোজা রাখে তার পূর্ববর্তী পাপ ক্ষমা করা হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০১)

আল্লাহ সবাইকে সঠিকভাবে রোজা রাখার তাওফিক দিন। আমিন।