দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় পর গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বদলে গেছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নানকে ১১ হাজার ৩৮৯ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন তিনি। জামায়াতে ইসলামীর এ বিজয় কাপাসিয়ার রাজনীতি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে সৃষ্টি করেছে।
গাজীপুর-৪ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৩০ হাজার ৯৭৭ জন। ভোট পড়েছে ৬১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আটজন প্রার্থীর লড়াইয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পেয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৭৭৯ ভোট। ধানের শীষ পেয়েছে ৯০ হাজার ৩৯০ ভোট।
কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের দরদরিয়া গ্রামে জন্মেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদ। তার বাড়ির পাশের দরদরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র স্বাধীনতার পর থেকে নৌকার একচ্ছত্র আধিপত্য দেখেছে। এবার সেই কেন্দ্রেই বদলে গেছে ফলাফল।
এ কেন্দ্রে ১ হাজার ৯৩৩ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ৯৬ জন। এর মধ্যে জামায়াত পেয়েছে ৬৭৮ ভোট, বিএনপি পেয়েছে ৩২৮ ভোট। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলেও ঐতিহাসিকভাবে এ কেন্দ্রটি ছিল তাদের ভোট ব্যাংক। ফলে, এই পরিবর্তনকে অনেকেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নিজ কেন্দ্র বেলাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়ে। সেখানে দাঁড়িপাল্লা পায় ১ হাজার ৫১৩ ভোট, ধানের শীষ ৫১১।
শাহ রিয়াজুল হান্নানের বাড়ির পাশের ঘাগুটিয়া চালা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট পড়ে প্রায় ৬৪ শতাংশ। সেখানে ধানের শীষ পায় ৮৫৩ ভোট, দাঁড়িপাল্লা পায় ৩৩৩।
নিজ নিজ ঘাঁটিতে প্রত্যাশিত ফল মিললেও সামগ্রিক চিত্রে ব্যবধান গড়ে দেয় অন্য কেন্দ্রগুলোর ফলাফল।
নির্বাচনের আগে স্থানীয়ভাবে ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। সাবেক মন্ত্রী আ স ম হান্নান শাহর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং তার পরিবারের প্রতি আবেগ ভোটে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, বিএনপির ভেতরের বিভক্তি, সমন্বয়হীন প্রচার এবং কিছু নেতা-কর্মীর নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ভোটারদের একাংশকে নিরুৎসাহিত করেছে।
কাপাসিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মফিজ উদ্দিন বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন একমাত্র নির্ধারক নয়। স্থানীয় ইস্যু, সংগঠনের শক্তি ও প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।”
বিএনপি প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নান বলেছেন, “ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তার দায়ভার আমি নিচ্ছি।”
অন্যদিকে, বিজয়ী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জানিয়েছেন, জনগণের রায়কে তিনি সম্মান করেন এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাপাসিয়াকে এগিয়ে নিতে চান।
কাপাসিয়ার এই ফলাফল শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি দীর্ঘদিনের ভোট ধারার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ঐতিহ্য, আবেগ ও অতীতের উন্নয়ন স্মৃতি—সবকিছুর ওপরে সংগঠনের কার্যকর উপস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য যে নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে, কাপাসিয়ার এই নির্বাচন তার স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে রইল।