অর্থনীতি

ছয় ফান্ডে রেস অ্যাসেটের মানিলন্ডারিং, ব্যবস্থা নিতে দুদক-এনবিআরে চিঠি

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম আয়কর দেখিয়ে ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা মানিলন্ডারিং করেছে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ছয়টি মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ অনিয়মের তথ্য পেয়েছে।

ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নিরীক্ষকরা সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে আপত্তি বা কোয়ালিফায়েড অডিট রিপোর্ট প্রদান করেছে। তাই এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

সম্প্রতি এ বিষয়ে বিএসইসির ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন থেকে সংস্থা দুইটির চেয়ারম্যান বরাবর পৃথক পৃথক চিঠি পাঠানো হয়েছে।

রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ১২টি মিউচ্যুয়াল ফান্ড পরিচালনা করে। এর মধ্যে ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম আয়কর দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফান্ডগুলো হলো- আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ফাস্ট জনতা ব্যাংক মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ইবিএল ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে।

কমিশন মনে করছে, নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম আয়কর প্রদর্শনের মাধ্যমে একদিকে বিনিয়োগকারীদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, অন্যদিকে মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়ম উদঘাটনে দুদক ও এনবিআরের মাধ্যমে যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিএসইসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাধীন পরিচালিত ছয়টি মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের নির্বাচিত আর্থিক প্রতিবেদন বিএসইসির নিকট দাখিল করা হলে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নিরীক্ষক ফান্ডগুলোর জন্য কোয়ালিফাইড অডিট রিপোর্ট দিয়েছে। নিরীক্ষক তার মতামতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি উল্লেখ করে যে, আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর অর্জিত আয় আয়কর মুক্ত হলেও আলোচা ফান্ডসমূহে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোট প্রায় ৯.৬৮ কোটি টাকা অগ্রিম আয়কর প্রদর্শন করা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১০ নভেম্বর ২০১১ সালে জারি করা এসআরও নম্বর ৩৩৩-আইন/আয়কর/২০১১ এর মাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ডের আয়কে কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক বৃহৎ করদাতা ইউনিট, ঢাকা বরাবর ১০ আগস্ট ২০১২ সালে ইস্যুকৃত পত্রের মাধ্যমে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে নগদ লভ্যাংশ প্রদানকালে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ এর ধারা ৫৪ অনুযায়ী উৎস কর কর্তন প্রযোজা বলে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ আয়কর আইন, ২০২৩ এবং আয়কর পরিপত্র ২০২৩-২০২৪ অনুযায়ী মিউচ্যুয়াল ফান্ড কর্তৃক অর্জিত সব ধরনের আয়কে আয়করমুক্ত ঘোষণা করা হলেও, বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট পিসিএল কর্তৃক পরিচালিত উপরোক্ত ৬টি মেয়াদী মিউচ্যুয়াল ফান্ড ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোট প্রায় ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, ২০২২-২০২৩ অর্থবছর ছাড়া ২০১১-২০১২ অর্থবছর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের আয় আয়করমুক্ত ছিল। পরবর্তীতে আলোচ্য ফান্ডসমূহের সম্পদ ব্যবস্থাপকের নিকট মিউচুয়াল ফান্ডের নিরীক্ষিত হিসাব প্রতিবেদনে নিয়মবহির্ভূতভাবে অগ্রিম আয়কর প্রদর্শনের বিষয়ে বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্টের কাছে প্রাসঙ্গিক প্রমাণসহ ব্যাখ্যা তলব করা হলে কমিশনের কাছে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ যেমন-চালান, ব্যাংক সার্টিফেকেট বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাখিল করতে ব্যর্থ হয়।

চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, সম্পদ ব্যবস্থাপক বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক উৎসে কর কর্তিত মাত্র প্রায় ২৮.১৮  লাখ টাকা ফেরত প্রদানের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকে পত্র প্রেরণ করে। তার কপি কমিশনের নিকট প্রেরণ করা হলেও সম্পদ ব্যবস্থাপক ফান্ডগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনের ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর পরিশোধ হিসাবে দেখিয়ে আসছে। সুতরাং নিয়মবহির্ভূতভাবে বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থপনাধীন ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর প্রদর্শনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি মানিলন্ডারিং হয়েছে বলে বিএসইসির কাছে প্রতীয়মান হয়।এমতাবস্থায় উপরোক্ত ফান্ডসমূহের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে বিএসইসির পক্ষ থেকে দুদক ও এনবিআরকে বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “মিউচ্যুয়াল ফান্ডের আয় আয়করমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে বিপুল অংকের অগ্রিম আয়কর দেখানো হয়েছে—এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আমরা সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে প্রাসঙ্গিক দলিলপত্র চেয়েছিলাম, কিন্তু সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাইনি।বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। তাই বিষয়টি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে দুদক ও এনবিআরের কাছে পাঠানো হয়েছে। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কমিশন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।”