লাইফস্টাইল

রমজানে নারীর বিশেষ মাসয়ালা

ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য রোজা ফরজ করেছে। রোজার মৌলিক বিধানের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের বিধান এক ও অভিন্ন। যেমন সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনসম্ভোগ পরিহার করা, যাবতীয় পাপ ও অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকা, ইত্যাদি। কিছু ক্ষেত্রে নারীর রোজার বিধান ভিন্ন। যেমন: 

১. ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে নারী নামাজ ও রোজা থেকে বিরত থাকবে। হায়েজ বা ঋতুস্রাবের জন্য ছেড়ে দেওয়া রোজাগুলো পরবর্তীতে কাজা করা আবশ্যক। তবে নামাজ কাজা করতে হবে না।

২. হানাফি মাজহাব অনুসারে হায়েজের সর্বনিম্ন সময় তিন দিন এবং সর্বোচ্চ সময় দশ দিন। যদি কারো তিনদিনের কম হায়েজ হয় এবং দশ দিনের বেশি হয়, তবে ইস্তিহাজা বা অসুস্থতা বলে গণ্য হবে। কোনো কারণে ঋতুস্রাবের সময় দশ দিনের চেয়ে বেড়ে গেলে নিজের আগের অভ্যাস অনুপাতে দিন গণনা করবে। অবশিষ্ট দিনগুলো অসুস্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। অসুস্থতার দিনগুলোর রোজার সঙ্গে সঙ্গে নামাজ ও কাজা আদায় করতে হবে। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৩০০)

৩. রমজান ছাড়া অন্য সময়ে রোজা রাখার ক্ষেত্রে নারীরা স্বামীর ইচ্ছাকে মূল্যায়ন করবে। বিশেষ করে যাদের স্বামী প্রবাসে বা দূরে থাকে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭৮২)

৪. ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে যদি পবিত্র হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয় অর্থাৎ নারী বুঝতে পারে যে, সে পবিত্র হতে যাচ্ছে, তবে রাতেই রোজার নিয়ত করবে এবং পানাহার থেকে বিরত থাকবে। যদি তার ধারণা সত্যি হয়, তবে সে রোজা পূর্ণ করবে। কিন্তু পুনরায় রক্ত আসা শুরু করলে রোজা ভেঙে ফেলবে।

৫. যদি কোনো নারীর পূর্ব অভ্যাস অনুযায়ী ধারণা হয় যে, আগামীকাল থেকেই ঋতুস্রাব শুরু হবে, তখন কেবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে রোজা ত্যাগ করবে না, বরং সে রক্ত দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। (আপকে মাসায়েল : ৩/২৭৮)

৬. যেহেতু ইসলামী শরিয়ত নারীকে ঋতুস্রাবের সময় রোজা ত্যাগ করার অনুমতি দিয়েছে, তাই নারীদের উচিত ঋতুস্রাবের স্বাভাবিক নিয়মকে ওষুধ খেয়ে ব্যাহত না করা। সে আল্লাহর বিধান অনুসারে এই দিনগুলোতে রোজা ত্যাগ করবে এবং পরবর্তীতে তা কাজা করে নেবে। কিন্তু কোনো নারী যদি ওষুধ খেয়ে হায়েজ বন্ধ রাখে এবং রোজা পালন করে, তবে তার রোজা আদায় হয়ে যাবে। (আপকে মাসায়েল : ৩/২০৭)

৭. সন্তান জন্মদানের পরবর্তী স্রাবকে ‘নিফাস’ বলে। নিফাসের সর্বোচ্চ সময়সীমা ৪০ দিন। তার চেয়ে বেশি হলে তা অসুস্থতা হিসেবে গণ্য হয়। কোনো নারী যদি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ৪০ দিনের আগেই পবিত্র হয়ে যায়, তাহলে রোজা রাখবে এবং নামাজ আদায়ের জন্য গোসল করে নেবে।

৮. যদি ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও স্রাব অব্যাহত থাকে, তাহলে সে রোজা রাখবে এবং গোসল করে নেবে। কেননা তার রক্ত ইস্তেহাজা বা রোগবিশেষ বলে গণ্য করা হবে। (শরহে বেকায়া : ১/১২০)

৯. ঋতুবতী নারী যদি সূর্য হেলার আগেই পবিত্র হয়ে যায় এবং রোজার নিয়ত করে, তাহলে তার ফরজ আদায় হবে না। কেননা ফরজ রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগেই করা আবশ্যক। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৩/৩৮৫)

১০. কোনো মেয়ে যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও লজ্জায় তা মা-বোনের কাছে প্রকাশ করে না এবং রোজাও রাখে না; তাহলে তার ওপর তাওবা করা ও ছুটে যাওয়া রোজার কাজা করা ওয়াজিব।

১১. কোনো গর্ভবতী অথবা সন্তানকে স্তন্যদানকারী  নারীর রোজা রাখলে যদি নিজের কষ্ট হয় অথবা তার শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্য রোজা না রাখার অবকাশ আছে। পরবর্তীতে কোনো সুবিধাজনক সময়ে তা কাজা করে নেবে।

১২. রোজা রাখার পর দিনের বেলা ঋতুস্রাব শুরু হলে নারীর রোজা ভেঙে যায়। এমন নারীর জন্য খাওয়া-দাওয়া করা বৈধ। তবে উত্তম হলো রোজাদারদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে পানাহার থেকে বিরত থাকা। ফজরের আগে পিরিয়ড শুরু হওয়ার বিধানও একই। (ফাতাওয়ায়ে হক্কানিয়া : ৪/১৯০; আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৪২৮)

১৩. ঋতুস্রাবের কারণে রোজাহীন অবস্থায় দিন শুরু করার পর পিরিয়ড বন্ধ হলে দিনের বাকি অংশ রোজাদারদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে পানাহার বর্জন করবে। কিন্তু এ দিনের রোজাও পরে কাজা করতে হবে। (আল বাহুরুর রায়েক : ২/২৯১)

১৪. রোজা রেখে শিশুকে দুধ পান করালে রোজা ভঙ্গ হয় না। (ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৬/৪০৮)

১৫. রমজানের রাতে গোসল ফরজ হলে গোসল না করেও দিনে রোজা রাখা বৈধ। গোসল না করায় রোজার ক্ষতি হবে না। তবে ফরজ গোসলে বিলম্ব করা অনুচিত।

১৬. ঋতুস্রাবের সময় নারীদের জন্য নামাজ পড়া, রোজা রাখা, কোরআন তিলাওয়াত ও মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা বিভিন্ন দোয়া, তাসবিহ ও জিকিরের মাধ্যমেও রমজানের বরকত হাসিল করতে পারবে।