চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী এলাকার ঝাউতলা বিহারি পল্লিতে বাস করছে সহস্রাধিক বিহারি পরিবার। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এ পল্লি। সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই জীবন এগিয়ে যাচ্ছে উর্দুভাষি বিহারিদের। বছর বছর আগুনে এ পল্লি পুড়েছে, আবার গড়েছেন তারা।
সরেজমিনে ঝাউতলা বিহারি পল্লি ঘুরে দেখা গেছে, ঘিঞ্জি পরিবেশে শত শত মানুষের বাস। ছোট ছোট ঘরে অনেক মানুষ এখনো যৌথ পরিবারে বাস করে।
নাগরিক সুবিধার দিক থেকে এই পল্লি এখনো অনেক পিছিয়ে। সরু গলি, অপরিকল্পিত বসতি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি আছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও সীমিত।
বিহারি পল্লির বাসিন্দা ষাটোর্ধ রিজিয়া সুলতানা জানান, তারা প্রায় পাঁচ যুগ ধরে এই এলাকায় বাস করছেন। তার পূর্বসূরীদের অনেকেই একসময় রেলওয়ের বিভিন্ন পদে চাকরি করতেন। সেই চাকরির সুবাদেই তারা চট্টগ্রামে থাকার সুযোগ পান।
তিনি বলেন, “বিহারি হলেও আমরা এখন বাংলাদেশের নাগরিক। পল্লির সবাই পেয়েছি জাতীয় পরিচয়পত্র। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনেও ভোটও দিয়েছি আমরা।”
আরেক বাসিন্দা জমিলা খাতুন জানান, আগের তুলনায় এখন তাদের জীবন কিছুটা ভালো। একসময় বিহারি পল্লিতে ছন আর কাগজ দিয়ে তৈরি ঘর ছিল। বর্ষা এলেই ভেঙে পড়ত বসতঘর। শুষ্ক মৌসুমের প্রায় প্রতিবছরই আগুন লেগে পুড়ত এই পল্লি। এখন অনেক পরিবার পাকা দেয়াল দিয়ে ঘর তুলেছে। বিদ্যুৎ ও টিনের ছাদ তাদের জীবনে কিছুটা স্থায়িত্ব এনেছে।
ঝাউতলা বিহারি পল্লির মানুষদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের। কেউ রিকশা চালান। কেউ ভ্যান চালান। কেউ ফল বিক্রি করেন। কেউ দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। নিয়মিত আয় নিশ্চিত নয়। দৈনিক আয়ের ওপরই তাদের সংসার চলে।
এই পল্লির একটি বড় অংশের মানুষ পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে কারচুপি, সূচিকর্ম, নকশা ও পোশাক সংশোধনের কাজে তাদের দক্ষতা রয়েছে। একসময় চট্টগ্রামের বাইরে তাদের হস্তশিল্পের কদর ছিল। এখন কাজ কমেছে। তবু, অনেক পরিবার এই পেশার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে।
ঝাউতলা বিহারি পল্লি শুধু একটি বসতি নয়। এটি ইতিহাসের সাক্ষী। রাষ্ট্রহীনতা থেকে নাগরিকত্বে ফেরার লড়াইয়ের নীরব দলিল। সীমিত সুযোগের মধ্যেও তারা বাঁচার পথ খুঁজে নিয়েছেন। উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই পল্লিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে, তাদের জীবন আরো বদলাতে পারে।