শিল্প ও সাহিত্য

অশিষ্ট উইলির আঙুল

ফানসু মানকিনের বয়স ৪৬। ফানসু মানকিনের সন্দেহ বয়স ৪৮ হয়েছে। তবে সন্দেহের কথা ফানসু মানকিন তার ঘনিষ্টতম বন্ধু খুড়তুতো ভাই উইলিয়াম মানকিনকে পর্যন্ত বলে নাই। যদিও তারা দুই ভাইবন্ধু এক সঙ্গে নেশাভাং করে। কিছু ব্যাপার নিজের ভেতরে রাখতে হয়- খ্রিস্টান পাড়ার অধিকাংশ মানুষ যেখানে ‘ছিটিয়াল’ মনে করে ফানসু মানকিনকে। ডেভিড রিবেরুর ছেলে উইলি বদমায়েশের হাড্ডি হয়েছে। বুড়া মাইকেলের চায়ের দোকানে বসে রং তামাশা করে ফানসু মানকিনকে নিয়ে। অপমান করে। অথচ এর কোনো কারণ নাই। অশিষ্ট উইলির সঙ্গে কিছু নাই ফানসু মানকিনের।

দুই ঘণ্টা আগে না বিশ ঘণ্টা আগে, উইলিয়াম মানকিন ও ফানসু মানকিন রুথ বুড়ির কুটিরে বসে টেনেছে, সেই নেশা এখনও যায় নাই। উইলিয়াম মানকিন চলে গেছে। কোথায় চলে গেছে? চাঁদে চলে গেছে। কীভাবে গেছে? জিরাফের মাথায় উঠে লাফ দিয়ে চাঁদ ধরে ঝুলে পড়েছে। চাঁদ থেকে এখন পৃথিবী দেখছে। খ্রিস্টান পাড়া দেখছে। বুড়া মাইকেলের চায়ের দোকানে উপবিষ্ট ফানসু মানকিনকে দেখছে। আরও কিছু কাস্টমার আছে দোকানে। যাকে দেখছে হাসি পাচ্ছে ফানসু মানকিনের। এ জন্য আর কাউকে না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে চোখ বন্ধ করল ফানসু মানকিন। চোখ বন্ধ করে ব্রাদার নাথানকে দেখল। ব্রাদার নাথান বললেন, ‘কেমন আছো মানসু ফানকিন?’ ব্রাদার নাথান সবসময় এই ভুল করেন। ফানসু মানকিনকে বলেন ‘মানসু ফানকিন’। ফানসু মানকিন ভুল শুধরে দিতে যায় না। ব্রাদার নাথান যেমন ছিলেন, শান্ত সভ্য সেই মানুষটা আছেন এখনও। মারা গেছেন বিশ বছর আগে।

ফানসু মানকিন বলল, ‘আমি অলটাইম গুড থাকি ব্রাদার।’ ব্রাদার নাথান বললেন, ‘তোমার মতো ভালো মানুষ আর নাই। কস্তার মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিলে তুমি?’ ‘মনে নাই ব্রাদার। কস্তার মেয়ে হান্নার বিয়ে কি সাতশ বছর আগে হয়েছে? তেনোচ্তিত্লানের গরিব জোলা মক-তে-সূ-মার সঙ্গে হয়েছে?’ ‘তা তুমি মনে করতে পারো মানসু ফানকিন। তোমার যা মনে হয়। হান্নার বিয়ে রিচার্ডের সঙ্গে হয়েছে। রিচার্ডের পরদাদা অলিভার রোজারিওকে তুমি দেখেছো। ছবি আঁকা শিখতে সেই কোন যুগে সুদূর কলকাতা গিয়েছিলেন অলিভার। মানসু ফানকিন, তুমি তাকাও।’

ফানসু মানকিন তাকালো এবং শীতার্ত সেবাস্তিন ডি কস্তাকে দেখল। হুডি পরার মতো শীত এখনও পড়ে নাই, কিন্তু সে সেবাস্তিন ডি কস্তা, চিরকালের শীতকাতুরে ব্যক্তি। সে একটা গাঢ় সবুজ হুডি পরে আছে। ভারী কাচের গোল চশমা পরে আছে। হুডির ছায়াছন্নতা থেকে চোখ দুটো তাতে ঠিকরে বের হয়ে আসছে অবস্থা! অ্যালিয়েন মনে হচ্ছে সেবাস্তিন ডি কস্তাকে।

ফানসু মানকিন বলল, ‘পেয়েছ সেবাস্তিন?’ সেবাস্তিন ডি কস্তা বলল, ‘পাই নাই। আশা ছাড়ি নাই। পাই নাই, পাব।’ ‘যতদিন না পাবে ভালো সেবাস্তিন।’ বুড়া মাইকেল চুলা, কেটলি, চায়ের সরঞ্জামের ধার থেকে বলল, ‘ও ফানসু ও মানকিনের ব্যাটা, তারা কেউ এখনও আসে নাই?’ ‘তোমার শ্বশুর সেবাস্তিন ডি কস্তা এসে আধঘণ্টা ধরে বসে আছে মাইকেল। তাকে যদি তুমি দেখতে না পাও, আমার বলার কিছু থাকতে পারে না।’ ‘রাগ করো কেন, মানকিনের ব্যাটা? দূরবিন নাই, ঠাহর করতে পারি নাই। সেবাস্তিন ডি কস্তা সবসময় শীতকালে থাকে। হা হা হা!’ ‘খুব একটা উন্নত মানের রসিকতা তুমি করতে পারো নাই মাইকেল। হা হা করে হাসার মতো কিছু নাই। সেবাস্তিন ডি কস্তা একজন উন্নত মানের অনুসন্ধানী। তুমি তোমার কাজ করো বুড়া। দুই চাপ কা বানাও...দুশ্শ্, দুই কাপ চা বানাও।’

সেবাস্তিন ডি কস্তা বলল, ‘তুমি একজন উন্নত মানের মানুষ ফানসু মানকিন। খ্রিস্টান পাড়ার মানুষ তোমাকে ছিটিয়াল বলে, তোমার ওয়েভ লেনথ ধরতে পারে না বলে। এই যে বুড়া মাইকেলের দোকানে আরও ক’জন মানুষ বসে আছে, এরা কেউ আমাকে দেখছে, বলো?’ ‘তোমাকে যদি তারা দেখত কী ভালোটা হতো সেবাস্তিন? ভূত-প্রেত মানুষ ভয় পায়।’ ‘তুমি কি ভূত-প্রেত আমাকে বলছো?’ ‘উদাহরণ দিচ্ছিলাম সেবাস্তিন। মাইন্ড করো না। তোমাকে ভূত-প্রেত আমি কোনো দিন বলি নাই। তুমি অ্যালিয়েন।’ ‘হতে পারি। যদি পাই। যদি না পাই আফসোস নাই।’ বুড়া মাইকেল বলল, ‘তোমাদের চা, ফানসু মানকিন।’ ফানসু মানকিন উঠে চায়ের কাপ নিল। চিন্তা করে নাই, এ সময় বুড়া মাইকেলের দোকানে ঢুকল বদমায়েশের হাড্ডি উইলি। ফানসু মানকিনকে দেখে তার কুতকুতে দুই চোখ চকচক করে উঠল, ‘আরে সন্ত ফানসু মানকিন যে!’

ফানসু মানকিন শুকনা গলায় বলল, ‘এই তো উইলি।’ ‘দুই কাপ চা নিয়েছো সন্ত ফানসু মানকিন, তুমি কি একসাথে দুই কাপ চা খাও?’ ‘না। কেন?’ বুড়া মাইকেল বলল, ‘উইলি!’ ‘বুড়া তুমি চুপ করে থাকো। সন্ত ফানসু মানকিন বলুক দুই কাপ চা সে কেন নিয়েছে। এখানে আর কেউ আছে তার সাথে?’ বুড়া মাইকেল বলল, ‘সেবাস্তিন ডি কস্তা আছে উইলি।’ ‘সেবাস্তিন ডি কস্তা? তুমি বুড়া তাকে দেখেছ? সন্ত ফানসু মানকিন যাদের দেখে বলে দাবি করে তুমি তাদের কখনো দেখেছো? সন্ত ফানসু মানকিন শুধু তাদের দেখতে পায় কেন? 

খ্রিস্টান পাড়ার উজবুকের দল ছিটিয়াল মনে করে সন্ত ফানসু মানকিনকে আবার এসব বিশ্বাস করে কীভাবে? মরা কিছু মানুষের শুধু নেশারু একটা মানুষের সাথেই দেখা হয়? বারবার দেখা হয়? কেন? সন্ত ফানসু মানকিন তুমি বলো।’ ফানসু মানকিন অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয় উইলি। কেন দেখ হয় আমি জানি না।’ ‘তারা তোমার সঙ্গে বসে চা খায়? ঠিক আছে, বসো। চায়ের কাপ রাখো। আর কোন হারামজাদা চা খায় দেখি।’ সেবাস্তিন ডি কস্তা বলল, ‘বেয়াদব।’ 

চায়ের কাপ রাখল ফানসু মানকিন। সেবাস্তিন ডি কস্তা তার কাপ নিল। ছোট ছোট করে চুমুক দিতে থাকল। উইলি দেখল চায়ের কাপ যেমনকে তেমন পড়ে আছে। ফানসু মানকিন তার চা শেষ করল। উইলি বলল, ‘কী হলো সন্ত ফানসু মানকিন? সেবাস্তিন ডি কস্তা চা খাচ্ছে না কেন?’ ‘খেয়েছে উইলি।’ ‘চা খেয়েছে? কাপের এক ফোটা চা কমে নাই!’ ‘সেটা তুমি দেখছ। কাপে চা নাই।’ ‘কাপে চা নাই?’ ‘না, উইলি।’ ‘এই যে তোমরা সবাই এই দুটা চায়ের কাপ দেখো। বুড়া মাইকেল তুমিও দেখো।’ বুড়া মাইকেল বলল, ‘দূরবিন আনি নাই।’ উইলি বলল, ‘দূরবিন আনো নাই মানে?’

‘তুমি কি মনে করো অর্বাচীন উইলি? আমি এখান থেকে উঠে এসে চায়ের কাপ দুটা দেখব। দূরবিন যদি আনতাম, দূরবিন দিয়ে দেখতাম। তুমি জানো আমার দূরবিন আছে। জাপানের ক্যানন কোম্পানির দূরবিন। আমার ব্যাটেল মামা জাপানের হোক্কাইডো প্রদেশের ওতারু শহরে থাকত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্ম হয়েছিল বলে তার নাম রাখা হয়েছিল ‘ব্যাটেল’। ব্যাটেল মামা অরিগামি পারত। কাগজ ভাঁজ করে এর তার মুখ হুবহু বানাতে পারত।’ ‘চুপ করো তুমি, বুড়া বকরবক। এই যে তোমরা, তোমরা দেখ।’

বুড়া মাইকেলের চায়ের দোকানের আড্ডা এই সময় জমে উঠতে থাকে। নিয়মিত কয়েকজন আসে। তারা এক দু’জন করে আসছে। আগে যারা ছিল তারা আছে। সবাই দেখল। ‘তোমরা কী দেখলে বলো? সন্ত ফানসু মানকিন এই যে দুটা চায়ের কাপ নিয়ে বসে আছে, এই দুই কাপে কি চা আছে?’ আমোদপ্রিয় জনতা রায় দিল, এক কাপে আছে, এক কাপে নাই। অযথা হিংস্র উইলি আমোদপ্রিয় না, ক্রুড়তা ফুটল তার কুটিল মুখাবয়বে, ‘তাহলে সন্ত ফানসু মানকিন, কী বলবে তুমি এখন? বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী তুমি? মরা মানুষের সঙ্গে তোমার দেখা হয়, মরা মানুষ তোমার সঙ্গে বসে চা খায়?’ ‘খায়।’

আমোদপ্রিয় জনতা, বুড়ো মাইকেল ও উইলি মূক হয়ে গেল। ফানসু মানকিনের সঙ্গে কে বসে আছে এটা? গাঢ় সবুজ হুডি পরে আছে বলে তার মুখ কেউ স্পষ্ট দেখল না। চোখ দেখল, চশমার কাঁচ ভেদ করে ঠিকরে বের হয়ে আসছে। মানুষটা বলল, ‘আমি সেবাস্তিন ডি কস্তা। একশ আটত্রিশ বছর আগে মারা গেছি। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে। অশিষ্ট উইলি, তুমি বলো, তুমি কী দেখছো? চা আছে নাকি নাই এই কাপে?’ উইলি ঢোক গিলে বলল, ‘আছে।’ ‘আমি তাহলে চা খাই নাই? হতে পারে। কিন্তু এই কাপে চা নাই উইলি। পরীক্ষা করে দেখতে পারো তুমি। চা থাকলে এতক্ষণে সেই চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার কথা।’

ভয় তরাসে বিপর্যস্ত এবং ভেতরে ভেতরে উন্মত্ত উইলি চা আছে কি না পরীক্ষা করে দেখতে বেকুবের মতো কাজ করল। ডান হাতের মধ্যমা চুবিয়ে দিল সেই চায়ের কাপে। সঙ্গে সঙ্গে যে ত্রাহি চিৎকার ছাড়ল, যারা শুনল তারা কোনো দিন ভুলবে না। কলজে কাঁপানো ভয়ার্ত চিৎকার! চায়ের কাপে চা নাই, কিছু নাই, কিন্তু সেই মধ্যমার অর্ধেক গলে নাই হয়ে গেছে উইলির। হাড়সুদ্ধ। সেবাস্তিন ডি কস্তাকে কেউ দেখল না আর।

পুনশ্চ: উইলির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। রহস্যময় বাতেন মামার সঙ্গে কিছু গোপন আঁতাত আছে উইলির। পুলিশের খাতায় উইলির নাম আছে- আঙুল কাটা উইলি। বাতেন মামার উৎসাহে উইলি আমাকে তার রহস্যময় কাহিনি বলেছে। বাতেন মামা মনে করেন আমি অশিষ্ট উইলির কাহিনি লিখব। কে মনে করল, কী মনে করল সেটা সবসময়ই ব্যাপার।

আঙুল কাটা উইলি ২১ বছর আগে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। আমি তখনও বাতেন মামাকে চিনি না। নামই শুনি নাই। মৃত উইলির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।