বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কাছে পুঁজিবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রিং সাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বরাদ্দকৃত জমির বিপরীতে সর্বশেষ ২০ মিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে। এ অর্থ পরিশোধের জন্য একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও, কোম্পানিটি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। বকেয়া পরিশোধ না করার কারণ ব্যাখ্যা চেয়েছে বেপজা।
একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাখ্যা প্রদান না করলে পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বরাদ্দকৃত প্লটের ইজারা বাতিল করার হুশিয়ারি দিয়েছে বেপজা।
সম্প্রতি রিং সাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা বরাবর এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ওই চিঠির অনুলিপি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা ইপিজেড ও কাস্টমস বন্ড কমিশনাটের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বেপজার চিঠিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি রিং সাইনের বকেয়া পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৩. ৭৩ মার্কিন ডলার (১৬.১৯ মিলিয়ন), যেখানে কোম্পানির আমানত ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৪৫.৪৪ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ কোম্পানির আমানতের চেয়ে বকেয়া পাওনা ৬৩ গুণেরও বেশি। বেপজা কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় ধরে একাধিকবার বকেয়া পরিশোধের জন্য অনুরোধ ও সুযোগ প্রদান করেছে।
এছাড়াও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা প্রদান করলেও প্রতিবারই তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি কয়েক মাসের নিয়মিত মাসিক বিলও পরিশোধ করা হয়নি এবং সর্বশেষ গত বছর ১৭ মে মাত্র ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
এতে প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বেপজার বকেয়া পরিশোধে গড়িমসি করছে। এ প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৫ কোম্পানিকে ২১ দিনের নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৮ নভেম্বর ঢাকা ইপিজেড এক্সটেনশন এলাকার প্লট নং ২৩১-২৩৬, ৭৯-৮৪ এবং ১৫৭-১৬৩ এর লিজ চুক্তি কেন বাতিল করা হবে না- এ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। ওই নোটিশের জবাবে রিং সাইন কর্তৃপক্ষ ২৪ নভেম্বর ব্যাখ্যা প্রদান করে। কিন্তু উক্ত ব্যাখ্যার সাথে ঢাকা ইপিজেড জোন অফিসের পর্যবেক্ষণের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বেপজার নির্বাহী দপ্তরে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার (১ মিলিয়ন ডলার) চলতি বছরের মধ্যে পরিশোধের অঙ্গীকার করে কোম্পানিটি। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৪৭.৪৪ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে কোম্পানটি।
চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন প্লটসমূহ অব্যবহৃত থাকায় এবং বকেয়া পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে প্লট নং ২৩১-২৩৫ এর লিজ চুক্তি বাতিল করা হয়। এরপর বেপজার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোম্পানিটি হাইকোর্টে রিট পিটিশন নম্বর ৪১৭৭/২০২৫ দায়ের করে।
হাইকোর্টের সম্পূরক আদেশে বলা হয়, পরবর্তী চার মাসের মধ্যে ২০ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। উক্ত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধ বিষয়ে বেপজার সাথে আলোচনা করতে হবে। পাশাপাশি চলতি চার্জসমূহ নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে।কিন্তু কোম্পানিটি হাইকোর্টের সম্পূরক আদেশ প্ররিপালনে ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তীতে শুনানি শেষে হাইকোর্ট রিট পিটিশন নং ৪১৭৭/২০২৫ খারিজ করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পুনরায় ২১ দিনের নোটিশ এবং ২৯ সেপ্টেম্বরে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও কোম্পানিটি কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি।
সর্বশেষ ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বরে আরেকটি নোটিশ দিলেও আজ পর্যন্ত কোনো বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হয়নি, যা লিজ চুক্তির শর্তাবলীর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত রিং সাইনের ২০.০৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি করেছে, কিন্তু এই সময়ে বকেয়া পরিশোধ করেছে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ। এছাড়া প্লট নম্বর ১৫৭-১৬৩ এ দীর্ঘদিন ধরে কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। এতে প্রতীয়মান হয় যে, কোম্পানিটি রপ্তানি অঞ্চলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তরিক নন। এই আচরণ জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং বকেয়া ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।দীর্ঘদিন বকেয়া পরিশোধ না করায় দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এমতাবস্থায়, এ চিঠি প্রাপ্তির তারিখ হতে সাত দিনের মধ্যে কেন ঢাকা ইপিজেড অঞ্চলের ১৫৭–১৬৩ নম্বর প্লটের ইজারা বাতিল করা হবে না-এ বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো।এছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব প্রদান করতে ব্যর্থ হলে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার পরবর্তী নোটিশ ছাড়াই লিজ চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হবে বলে চিঠিতে জানায় বেপজা।
এদিকে, সম্প্রতি রিং সাইন টেক্সটাইলেল প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে সংগ্রহীত অর্থ ব্যবহার করার জন্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার অবমুক্তির আবেদন বাতিল করেছে বিএসইসি। আইপিও তহবিলের অর্থ অবমুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় আইপিও তহবিল ছাড়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
জানা গেছে, রিং সাইন টেক্সটাইল প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ১০টাকা মূল্যের ২৭ কোটি ৫১ লাখ ৪ হাজার ৮২০টি শেয়ার ইস্যু করে মোটি ২৭৫ কোটি ১০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে। কোম্পানিটি তার পরিশোধিত মূলধন ৯.৯৫ কোটি টাকা হতে ২৮৫.০৫ কোটি টাকায় উন্নীত করে। পরবর্তীতে অর্থ জমা ছাড়া প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার ইস্যু বা বরাদ্দের মাধ্যমে ২৭৫ কোটি টাকার মূলধন বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট সংঘবদ্ধ আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠে এবং এ বিষয়ে তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশন আইনি প্রক্রিয়ায় শুনানি শেষে রিং সাইন টেক্সটাইলের প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পুঁজিবাজারে রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড তারিকাভুক্ত হয় ২০১৯ সালে। বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগিরির এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সে হিসেবে কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৫০ কোটি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৩টি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকের হাতে ৩৬.৪৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫.১৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৮.৩৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।