ক্যাম্পাস

উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক রাজনীতি: সংকটের মূল কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয় আজ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠার পরিবর্তে ক্রমশ দলীয় প্রভাবের বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাকাঠামোতেও পরিবর্তন ঘটে, প্রশাসনিক পদে আসেন নতুন ‘ক্ষমতাশালী’ শিক্ষকরা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয় কী সত্যিই স্বাধীন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে টিকে আছে?

Public University Ordinance 1973-এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে শুরু করে দলীয় সম্পৃক্ততার দীর্ঘ সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০১৯ সালে Mohammad Omar Shiddike পরিচালিত একটি কেস স্টাডি, যা প্রকাশিত হয় World Journal of Education-এ। সেখানে দেখা যায়, শিক্ষকরা যখন সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন, তখন তার সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের শেখা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক একাডেমিক সংস্কৃতিতে।

গবেষণার ফলাফলে উঠে আসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় শিক্ষকরা অনেক সময় ক্লাস প্রস্তুতি, গবেষণা ও প্রকাশনায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। কিছু ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব দেখা যায়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলীয় বিভাজন, পক্ষপাতমূলক মূল্যায়ন এবং ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

আমাদের রাজনৈতিক সচেতনতার একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক চব্বিশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষকদের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ছিল অনন্য। কিন্তু ‘লেজুড়বৃত্তি’ সেই ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।

পার্থক্যটা স্পষ্ট, আগে রাজনীতি ছিল জাতীয় স্বার্থে ও আদর্শের ভিত্তিতে; আর এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা, প্রমোশন এবং প্রশাসনিক পদ (ভিসি, প্রক্টর ইত্যাদি) পাওয়ার হাতিয়ার। নাগরিক হিসেবে রাজনীতির অধিকার থাকলেও, যখন তা পেশাদারিত্বকে গ্রাস করে, তখন তা আর অধিকার থাকে না—হয়ে ওঠে অনৈতিকতা।

নাগরিক হিসেবে রাজনীতিতে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের সাংবিধানিক অধিকার। শিক্ষকও এর ব্যতিক্রম নন। তবে প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যদি পেশাগত দায়িত্বকে প্রভাবিত করে, তাহলে কি তা গ্রহণযোগ্য? শিক্ষক যখন দলীয় পরিচয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন, তখন তার পেশাদার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষককে এখনো নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শ হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষার্থীরা তাদের কাছ থেকে কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই নয়, মূল্যবোধ ও চিন্তার দিকনির্দেশনাও পায়। ফলে শিক্ষক যদি প্রকাশ্যে দলীয় অবস্থান নেন এবং তা শ্রেণিকক্ষে প্রতিফলিত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে গবেষণা, পেশাগত উন্নয়ন এবং একাডেমিক উৎকর্ষের জায়গায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কমে গেলে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; বরং জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ শিক্ষক রাজনীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এর ফলে দলীয় প্যানেল, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভাজন এবং প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই কাঠামো পুনর্বিবেচনা ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন, এমন মত গবেষকের।

তাই, এখন প্রয়োজন বৃহত্তর পরিসরে গবেষণা এবং খোলামেলা সংলাপ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল, সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি পেশাগত নীতিমালা জোরদার করা জরুরি, যাতে শ্রেণিকক্ষ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে এবং বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল উদ্দেশ্য, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। শিক্ষক যদি জ্ঞানের চেয়ে দলীয় পরিচয়ে বেশি আলোচিত হন, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো প্রজন্ম। নাগরিক হিসেবে রাজনীতিতে অংশ নেওয়া যেমন অধিকার, তেমনি শিক্ষক হিসেবে পেশাদার নিরপেক্ষতা বজায় রাখা দায়িত্ব।

প্রশ্ন এখন একটাই, শিক্ষাঙ্গন কি আবার স্বাধীন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে ফিরবে, নাকি দলীয় ছায়াই হয়ে থাকবে প্রধান নিয়ামক! সিদ্ধান্ত নিতে হবে নীতি-নির্ধারক ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকলকেই।