মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহতের ঘটনায় ভারতের উত্তর প্রদেশ, কাশ্মীরসহ বিভিন্ন রাজ্যে শিয়া মুসলিমরা বিক্ষোভ ও মাতম করছেন।
প্রতিবাদকারীরা ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে সামরিক অভিযানের নিন্দা করেছেন। তারা একে মুসলিম বিশ্বের জন্য বিরাট ক্ষতি বলে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক মহলকে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে না যায়।
রবিবার (১ মার্চ) সকাল থেকে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের প্রধান চত্বরে লাল, কালো ও হলুদ পতাকা হাতে সমবেত হন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীরা। আবেগঘন হলেও সমাবেশটি ছিল শান্তিপূর্ণ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায় তাদের। শিয়া তরুণদের বুক চাপড়ে মাতম করতে দেখা যায়।
বিক্ষোভকারী সাইয়্যেদ তৌফিক বলেন, “আজ আমাদের সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত। আমাদের প্রিয় নেতা শহীদ হয়েছেন, আমরা শোক পালন করছি।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের ট্রাম্পের প্রতি একটি বার্তা আছে… আমরা সবসময় আপনার নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াব। যদি মনে করেন আমাদের প্রিয় নেতাকে শহীদ করে আমাদের দমিয়ে দিতে পারবেন, তবে তা ভ্রান্ত ধারণা… আমরা, খামেনির সন্তানরা, যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন অত্যাচার চলতে দেব না।”
কাশ্মীরের বান্দিপুর, বুদগাম ও রামবান এলাকাতেও শিয়া মুসলিমরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। রামবানে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেয়, ‘তুম কিতনে হোসেইনি মারোগে... হার ঘর সে হোসেইনি নিকলেগা’। এর অর্থ ‘কত হোসেনিকে হত্যা করবে, প্রতিটি ঘর থেকে একজন হোসেনি জেগে উঠবে।”
বিক্ষোভ চলাকালীন তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুশপুতুল পোড়ায়। এ সময়ে বিক্ষোভকারীরা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিকৃতি ও ইরানের পতাকা বহন করেন। রাস্তায় ছিল কালো পতাকা এবং ঐতিহ্যবাহী শোক স্লোগান (নওহা)।
খামেনি এবং তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুতে শোক বার্তা প্রকাশ করেছে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের শিয়া সমিতি। জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপি প্রধান মেহবুা মুফতি ইজরায়েল এবং আমেরিকার এই হামলা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
মেহবুবা মুফতি বলেন, “মুসলিম বিশ্বের একটি সরব কণ্ঠস্বর ইরান। কোনো মিসাইল ইরানের সার্বভৌমত্বকে লঙ্ঘন করতে পারবে না।”
এদিকে কাশ্মীরের প্রধান ইমাম মীরওয়াইজ উমর ফারুকও ইরানের ওপর হামলার প্রতিবাদ করেছেন।
উত্তর প্রদেশের বিশিষ্ট মুসলিম ধর্মীয় নেতা অল ইন্ডিয়া মুসলিম জামাতের জাতীয় সভাপতি মাওলানা মুফতি শাহাবুদ্দিন রজভী বেরেলভী (রহ.) বলেন, “প্রায় চার দশক ধরে ইরানের নেতৃত্বদানকারী খামেনির মৃত্যু মুসলিম বিশ্বের জন্য গভীর ক্ষতি। এটি শুধু ইরানের মানুষের জন্য নয়, যারা তাকে সম্মান করতেন, তাদের সকলের জন্যই শোক ও বেদনার মুহূর্ত।”
তিনি অভিযোগ করেন, বহু বছর ধরেই তাকে টার্গেট করা হচ্ছিল এবং এই হামলা ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা।
পাশাপাশি ভারতে প্রতিবাদকারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার শান্তিপূর্ণভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে শাহাবুদ্দিন রজভী বেরেলভী বলেন, যেন কোনোভাবেই হিংসা বা অশান্তির সৃষ্টি না হয়।
লখনউ ইসলামিক সেন্টারের চেয়ারম্যান মাওলানা খালিদ রশিদ ফিরঙ্গী মাহালী ইরানে হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “ইরান একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র। ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলা চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে।”
তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
শিয়া ধর্মীয় নেতা মাওলানা সাইফ আব্বাসও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এই হামলা সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের শামিল এবং বিশ্বজুড়ে এর নিন্দা হওয়া উচিত।”
তিনি আন্তর্জাতিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসনের সমালোচনা করে ক্রমবর্ধমান হিংসার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কাশ্মীর, উত্তর প্রদেশ ছাড়াও ভারতের যেসব এলাকায় শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে, সেসব এলাকাতেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।