কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় নতুন করে আরেকটি উপজেলা, একটি পৌরসভা ও তিনটি ইউনিয়ন গঠনের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস।
জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. শামীম আল ইমরান জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের পাঠানো অর্ধ-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) হাতে পাওয়ার পরই এ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নতুন উপজেল মাতামুহুরী: মাতামুহুরী নদীর তীরে অবস্থিত চকরিয়া কক্সবাজার জেলার অন্যতম বৃহৎ উপজেলা। বর্তমানে এখানে ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। ১৯৮৩ সালে উপজেলায় উন্নীত এবং ১৯৯৩ সালে থানায় রূপান্তরিত হয়। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, জনসংখ্যা ৫ লাখ ৭১ হাজার ২৭৪ জন।
বৃহৎ আয়তন ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে সরকারি দপ্তরগুলো দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সাধারণ মানুষকেও দূর-দূরান্তে গিয়ে প্রশাসনিক সেবা নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে মাতামুহুরী নামে পৃথক উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন এলাকাবাসী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের স্থানীয় ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম জানান, প্রস্তাব অনুযায়ী, চকরিয়া উপজেলা থেকে পৃথক করে শাহারবিল, ভেওলা মানিকচর, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া ও বদরখালী ইউনিয়ন নিয়ে “মাতামুহুরী” নামে নতুন উপজেলা গঠন করা হবে।
পেকুয়া পৌরসভা গঠনের উদ্যোগ: ২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল চকরিয়া থেকে পৃথক হয়ে সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে পেকুয়া উপজেলা গঠিত হয়। বর্তমানে এখানকার জনসংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৭ জন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পেকুয়াকে পৌরসভায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন। দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে।
পেকুয়া উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর জন্য দুটি খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহাবুবুল আলম মাহাবুব জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সমীক্ষা প্রতিবেদনসহ প্রস্তাব পাঠানো হবে।
এক সভায় জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের উপস্থিতিতে পেকুয়াকে পৌরসভায় উন্নীত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুটি প্রস্তাব পাঠানো হবে, একটিতে শুধু পেকুয়া মৌজা, অন্যটিতে পেকুয়া ও মেহেরনামা মৌজা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “পৌরসভা গঠিত হলে পেকুয়া সদর বা মেহেরনামা নামে নতুন একটি ইউনিয়ন গঠন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে প্রস্তাব চূড়ান্ত করবেন, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।”
নতুন ৩ ইউনিয়ন: চকরিয়া উপজেলা থেকে বড় ইউনিয়নগুলো ভেঙে পৃথক ইউনিয়ন করার কার্যক্রম শুরু হয়েচে বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্থানীয় ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম জানান, চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়ন থেকে পৃথক করে ‘উত্তর হারবাং ইউনিয়ন’, বরইতলী ইউনিয়ন থেকে ‘পহরচাঁদা ইউনিয়ন’ এবং ডুলহাজারা ইউনিয়ন থেকে ‘মালুমঘাট ইউনিয়ন’ গঠনের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী জানান, শিগগিরই বিষয়টি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় উপস্থাপন করা হবে এবং চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, “ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।”
এলাকাজুড়ে উচ্ছ্বাস: নতুন উপজেলা ও পৌরসভা ঘোষণার খবরে চকরিয়া-পেকুয়া অঞ্চলে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলার শাহারবিল ইউনিয়নের বাসিন্দা জালাল উদ্দিন বলেন, “মাতামুহুরী উপজেলা হলে আমাদের প্রশাসনিক কাজের জন্য আর চকরিয়া পর্যন্ত যেতে হবে না। ফলে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও হাতের নাগালে আসবে।”
পেকুয়া বাজারের ব্যবসায়ী জহিরুল আলম বলেন, “পৌরসভা হলে পরিকল্পিত ড্রেনেজ, সড়ক উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য আরো প্রসারিত হবে। এটা আমাদের জন্য বড় সুখবর।”
মেহেরনামা এলাকার কলেজছাত্রী ফারাজানা আক্তার বলেন, “নতুন পৌরসভা হলে শহরের মতো সুযোগ-সুবিধা তৈরি হবে। মেয়েদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ আরো উন্নত হবে বলে আমরা আশা করছি।”
কোনাখালী ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল আবছার বলেন, “দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল আলাদা উপজেলা। এখন তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে ইনশাআল্লাহ।”
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না বলেন, “মাতামুহুরী উপজেলা ও পেকুয়া পৌরসভা গঠনের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের জনদাবির প্রতিফলন। চকরিয়া ও পেকুয়ার দূরত্ব, জনসংখ্যার চাপ ও সেবার সীমাবদ্ধতা যেন পোহাতে না হয় সেজন্য এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। নতুন উপজেলা ও পৌরসভা বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে যাবে।”
তিনি বলেন, “আমরা আশা করি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে বিষয়টি নিকার সভায় অনুমোদন দেওয়া হবে এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বিএনপি সবসময় জনস্বার্থের উন্নয়নমূলক উদ্যোগকে সমর্থন করে এবং এই উদ্যোগও জনগণের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস।”