সারা বাংলা

সিলেটে মায়ের গর্ভেই মারা গেছে ১০ হাজার শিশু

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও সিলেট বিভাগে থামছে না মাতৃগর্ভে শিশুমৃত্যু। গত ছয় বছরে (২০২০–২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) সরকারি হিসাবে বিভাগের চার জেলায় ১০ হাজার ১৮৮টি শিশু জন্মের আগেই মায়ের গর্ভে মারা গেছে। একই সময়ে বিভাগীয় সর্বোচ্চ চিকিৎসাকেন্দ্র সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরো ৩ হাজার ৬১টি মৃত শিশুর প্রসব হয়েছে। 

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, প্রতি বছর প্রায় দেড় হাজার শিশুর মৃত্যু হচ্ছে গর্ভকালীন ২৬ থেকে ৪২ সপ্তাহের মধ্যে। মৃত শিশুদের বড় অংশ হাওর, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার। 

ছয় বছরে বিভাগের চার জেলা পরিসংখ্যানের দেখা যায়, সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত ছয় বছরে ১ হাজার ৪৪৬টি মৃত শিশুর প্রসব হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ২৫৫টি, ২০২১ সালে ২৫৫টি, ২০২২ সালে ২৭৬টি, ২০২৩ সালে ২১৬টি, ২০২৪ সালে ২৪৫টি ও ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৯৯টি রয়েছে। 

সুনামগঞ্জ জেলায় ২০২০ সালে ৩৫০টি, ২০২১ সালে ৩১০টি, ২০২২ সালে ৪২৯টি, ২০২৩ সালে ৪৬০টি, ২০২৪ সালে ৪৮৫টি ও ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪০৩টি মৃত শিশু প্রসব হয়েছে।

হবিগঞ্জ জেলায় ২০২০ সালে ৪৬৮টি, ২০২১ সালে ৫২৮টি, ২০২২ সালে ৩৮০টি, ২০২৩ সালে ৩৪৩টি, ২০২৪ সালে ৩৫৫টি ও ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩০৫টি  শিশু মায়ের গর্ভে মারা গেছে। 

মৌলভীবাজার জেলায় ২০২০ সালে ১২৯টি, ২০২১ সালে ১৫৬টি, ২০২২ সালে ১৮৫টি, ২০২৩ সালে ১৫৬টি, ২০২৪ সালে ১২০টি ও ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১৯টি শিশু মাতৃগর্ভে মারা গেছে। 

চার জেলার পরিসংখ্যানকে হার মানিয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য। এই হাসপাতাল থেকে গত ছয় বছরে মাতৃগর্ভে ৩ হাজার ৬১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ৩৮৪টি, ২০২১ সালে ৪১৭টি, ২০২২ সালে ৩৬৪টি, ২০২৩ সালে ৫৮৩টি, ২০২৪ সালে ৫০৯টি এবং ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৮০৪টি মৃত শিশু রয়েছে। 

হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জেলার তাহিরপুর, শাল্লা, ধর্মপাশা ও দোয়ারাবাজারের মতো এলাকায় বছরের প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধতা থাকে। ফলে গর্ভবতী নারীদের পক্ষে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রাশিদা আখতার বলেন, মাতৃগর্ভে শিশুমৃত্যুর ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যায় না। বাকি অংশের পেছনে রয়েছে প্রসবপূর্ব নিয়মিত চেকআপের অভাব, মায়ের অপুষ্টি, কুসংস্কার, সিজারভীতি ও দেরিতে হাসপাতালে নেওয়ার প্রবণতা।

চিকিৎসকেরা বলছেন, গর্ভকালীন অন্তত চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি। কিন্তু গ্রামীণ অনেক নারী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চিকিৎসকের কাছে যান না। অনেক পরিবার গ্রাম্য দাই, কবিরাজ বা ওঝার ওপর নির্ভরশীল থাকে।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক গর্ভবতী নারী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। এ ছাড়া বিভাগে ডাক্তার ও নার্সের শূন্যপদের হার তুলনামূলক বেশি। নিয়োগ পেলেও অনেকে দ্রুত বদলি নিয়ে চলে যান।