ইরানের ভেতরে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার জন্য ইরাকের কুর্দি নেতাদের কাছে অনুরোধ করার পর কুর্দি বাহিনীর একটি অংশ ইরান সীমান্তের কাছে জড়ো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) কুর্দি কর্মকর্তারা এই কথা স্বীকার করেছেন। খবর আলজাজিরার।
উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে অবস্থিত কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির কর্মকর্তা খলিল নাদিরি এপিকে বলেন, “কিছু কুর্দি বাহিনী ইরান সীমান্তের কাছাকাছি সুলায়মানিয়াহ প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিয়েছে এবং তারা প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে।”
নাদিরি জানান, সম্ভাব্য অভিযানের বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা কুর্দিবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে তিনি এই বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এ ছাড়া আরেকটি কুর্দি ইরানি গোষ্ঠী ‘কোমালা’-এর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাদের বাহিনী এক সপ্তাহের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করতে প্রস্তুত এবং উপযুক্ত পরিস্থিতির অপেক্ষায় রয়েছে।
কুর্দি-ইরানি মিশিয়ারা ইরানে আক্রমণ শুরুতে যাচ্ছে? এখনো কোনো পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিশ্চিয়তা পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইরাকের কুর্দি বাহিনী প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্থানের নেতা বাফেল তালাবানির সঙ্গে কথা বলেছেন। একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তালাবানির সঙ্গে কথা বলেন।
আরাগচি ইরাক সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় “সন্ত্রাসী তৎপরতা” সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
এদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযাযী, এরই মধ্যে ‘কুর্দি-ইরানি মিলিশিয়ারা’ উত্তর-পশ্চিম ইরানে স্থল অভিযান শুরু করেছে।
তবে আলজাজিরা স্বাধীনভাবে এই তথ্য যাচাই করতে পারেনি। তবু ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে একটি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ইঙ্গিত ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
লন্ডনে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব
লন্ডনে ইরানের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আলী মৌসাভিকে তলব করেছে যুক্তরাজ্য সরকার।
আলজাজিরা লিখেছে, মৌসাভিকে ডেকে পাঠানোর ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ইরানের ভূমিকার বিষয়টি জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ব্রিটিশ মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকোনার ইরানের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠান।
যুক্তরাজ্য সরকার বলেছে, এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ইরানের ‘উত্তেজনাপূর্ণ আচরণের’ পরিপ্রেক্ষিতে, যা তারা মনে করছে ওই অঞ্চলে বৃহত্তর সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলায় শরিক না হওয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে চলেছেন। তারই মধ্যে ইরানের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিল লন্ডন।
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটি আঘাত করা ড্রোন ইরান থেকে ছোড়া নয়: যুক্তরাজ্য
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ঘাঁটিতে আঘাত করা ড্রোনটি ইরান থেকে ছোড়া নয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাইপ্রাসে অবস্থিত তাদের রয়্যাল এয়ার ফোর্স আক্রোটিরিকে লক্ষ্য করে যে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল, সেটি ইরান থেকে ছোড়া হয়নি।
আলজাজিরা লিখেছে, তবে ড্রোনটি ঠিক কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে তারা কিছু জানায়নি।
আক্রোটিরি ঘাঁটিটি সাইপ্রাসের উপকূলীয় শহর লিমাসোলে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। ১৯৬০ সালে সাইপ্রাস স্বাধীন হওয়ার পরও যুক্তরাজ্য যে দুটি সামরিক ঘাঁটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, এটি তার একটি। এখানে শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, দায়িত্বে থাকা সেনা সদস্যদের পরিবারও বসবাস করে।
সোমবারের এই হামলার ঘটনা ঘটে এমন সময়, যখন যুক্তরাজ্য ঘোষণা দেয় যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে।
এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া তথ্যে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা অঞ্চলজুড়ে নিজেদের ও মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটিতে নতুন করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত রয়্যাল নেভির হেলিকপ্টার আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সাইপ্রাসে পৌঁছাবে বলেও জানানো হয়েছে।
ডুবিয়ে দেওয়া ইরানি রণতরি থেকে ৮৭ মরদেহ উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন বাহিনীর ডুবিয়ে দেওয়া একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ থেকে অন্তত ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী।
বার্তা সংস্থা এপিতে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর কমান্ডার বুদ্ধিকা সম্পথ বলেছেন, “ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় জাহাজটির কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। সেখানে কেবল তেলের দাগ এবং লাইফ ক্র্যাফট দেখা গেছে। আমরা পানিতে ভাসমান মানুষ খুঁজে পেয়েছি।”
এর আগে জানানো হয়, অন্তত ৩২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পার্লামেন্টে জানান, জাহাজটিতে মোট প্রায় ১৮০ জন আরোহী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধার করা মরদেহগুলো তীরে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে মুখপাত্র জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে আরো সেনা ও অস্ত্র পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার ইরানে মার্কিন অভিযান সম্পর্কে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে লড়তে মধ্যপ্রাচ্যে আরো সেনা ও অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে।
তিনি বলেছেন, আমেরিকা ইরানে জয়লাভ করতে যাচ্ছে...। আমাদের এবং আমাদের মিত্রদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রচুর রানওয়ে রয়েছে। আমরা যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ সহজেই এই লড়াই চালিয়ে যেতে পারি।”
হেগসেথ দাবি করেন, এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ‘ইরানের আকাশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ পাবে।
তিনি বলেন, “আরো বড় ঢেউ আসছে। আমরা সবেমাত্র শুরু করছি।...যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নির্ভুল মাধ্যাকর্ষণ বোমার সীমাহীন মজুদ রয়েছে, যা তারা এই যুদ্ধে ব্যবহার করবে।”
ইরানের ১৪০ নাবিক নিখোঁজ
ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে ১৪০ জন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবার শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে।
বুধবার ভোরে ইরানি নৌবাহিনীর জাহাজ ‘আইআরআইএস দেনা’ থেকে একটি বিপদের ডাক পাওয়ার পর ৩২ জনকে উদ্ধার করেছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর মুখপাত্র বুধিকা সম্পথ বলেছেন, “যদিও এটি আমাদের জলসীমার বাইরে ছিল, এটি আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অঞ্চলের মধ্যে ছিল। তাই আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে আমরা সাড়া দিতে বাধ্য ছিলাম। আমরা পানিতে ভাসমান লোকদের খুঁজে পেয়েছি, তাদের উদ্ধার করেছি এবং পরে যখন আমরা অনুসন্ধান করি তখন আমরা জানতে পারি যে তারা ইরানের একটি জাহাজের লোক।”
তিনি জানান, জাহাজের নথি অনুসারে ১৮০ জন জাহাজে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুখপাত্র জানান, উদ্ধার অভিযান শুরু করার সময় তারা জাহাজটি দেখতে পাননি। তবে জলে তেলের দাগ এবং ভাসমান লাইফ র্যাফ্ট দেখেছেন। জাহাজটি ডুবে যাওয়ার জন্য সাবমেরিন আক্রমণের রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন এবং এর কারণ অজানা বলে জানিয়েছেন।
এর আগে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এয়ার ভাইস মার্শাল সম্পথ থুইয়াকোন্থা বিবিসি সিংহলীকে জানিয়েছিলেন, প্রায় ১৪০ জন নিখোঁজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখনো পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী জাহাজটি ডুবে যাওয়ার কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত মিশনের
ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তে গঠিত জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত মিশন দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
বুধবার (৪ মার্চ) এক বিবৃতিতে ইরানে তদন্ত করা জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন বলেছে, “এই হামলাগুলো জাতিসংঘ সনদের পরিপন্থি, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”
তদন্ত মিশনটি আরো জানায়, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি সম্মান দেখানো সব দেশের দায়িত্ব।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ ইরানে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যাতে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
পাঁচ দিনের টানা হামলায় ইরানের বহু বেসামরিক স্থাপনা, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়েছে গেছে, নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় নিদারুণ জীবন-যাপন করছে ইরানের মানুষ। পবিত্র রমজান মাসে রোজাদার মানুষের কষ্ট বেড়েছে সীমাহীন; তার মধ্যে হতাহতদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভৎস পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে তাদের।
সূত্র: আলজাজিরা।