আন্তর্জাতিক

বিশ্লেষণ: স্থলবাহিনী ছাড়া ইরানে সরকার পরিবর্তনে সফল হবেন ট্রাম্প?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি শুধু বিমান হামলা দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে চায়, তাহলে তা খুবই কঠিন কাজ; এমনকি প্রায় অসম্ভব। এমনটি মনে করেন সাংবাদিক আলি হারব, যিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করছেন। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি, আরব-আমেরিকান বিষয়াবলি, নাগরিক অধিকার এবং রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদন করেন।

আলজাজিরায় আলি হারব লিখেছেন, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বোমা হামলা শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি এই যুদ্ধ থেকে শুধু ‘ইরানের জনগণের স্বাধীনতা’ চান।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো।

স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেলি গ্রিকো আলজাজিরাকে বলেছেন, স্থলবাহিনী ছাড়া এমন বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা খুব কঠিন।

তিনি বলেন, “সরকার পরিবর্তনের জন্য যে বড় মূল্য দিতে হয়, তারা তা দিতে রাজি নন বলেই মনে হচ্ছে। তাই হয়তো কিছু গৌণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদি কেবল বিমান শক্তি দিয়ে মূল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না হয়।”

হামলা শুরুর পর ট্রাম্প ইরানের জনগণকে বলেন, তাদের ‘স্বাধীনতার মুহূর্ত’ এসে গেছে।

তিনি বলেন, “আমরা শেষ করলে তোমরাই তোমাদের সরকার দখল করবে।”  যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকারকে সরাতে চায়।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী সহ-সভাপতি ম্যাথিউ ডাস বলেন, কেবল বিমান হামলা দিয়ে কোনো দেশের সরকার পতন ঘটানোর উদাহরণ নেই।

“আপনি ভবন ধ্বংস করতে পারেন, ক্ষতি করতে পারেন; কিন্তু শুধু বিমান শক্তি দিয়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে- এমন নজির নেই,” বলেন ডাস।

২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটোর নেতৃত্বে বিমান হামলা চালিয়ে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল। তবে সেখানে স্থলভাগে লিবিয়ার বিদ্রোহীরাই সরাসরি লড়াই করেছিল।

এদিকে ট্রাম্প ও অন্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার আহ্বান জানালেও বর্তমানে এমন কোনো শক্তিশালী সংগঠিত বাহিনী দেখা যাচ্ছে না, যারা ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে পারে।

স্থলবাহিনী পাঠানো হবে? যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি, তবে তা করলে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি বাড়বে এবং এটি ট্রাম্পের ‘দ্রুত ও সীমিত যুদ্ধ’ নীতির বিপরীত হবে।

ডাস বলেন, “ইরানে এখনো মার্কিন স্থলবাহিনী না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধটি ইতোমধ্যে অজনপ্রিয়।”

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-চতুর্থাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী সহ-সভাপতি ম্যাথিউ ডাস ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, তখন বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় ৫৫ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক সমর্থন জানিয়েছিলেন।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল এক গোপন ব্রিফিংয়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশঙ্কা করছেন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানে স্থল অভিযান চালাতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কে রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সরকার পরিবর্তনের বদলে তুলনামূলক সীমিত লক্ষ্যের কথা বলেছেন, যেমন ইরানের পারমাণবিক ও ড্রোন কর্মসূচি এবং নৌবাহিনী ধ্বংস করা।

হেগসেথ জোর দিয়ে বলেন, এই অভিযান ‘অন্তহীন যুদ্ধতে’ পরিণত হবে না।

তবে কেলি গ্রিয়েকো বলেন, ট্রাম্পের লক্ষ্য আসলে কী, তা পরিষ্কার নয়।

“আমরা আসলে কী অর্জন করতে চাই? প্রশাসন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বার্তা দিতে পারেনি,” বলেন তিনি।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “পরিস্থিতি আপনারা যতটা ভাবছেন, তার চেয়েও খারাপ। ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। এই যুদ্ধ মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছে এবং এখনো এর স্পষ্ট কারণ বা শেষ করার পরিকল্পনা জানানো হয়নি।”