মাহে রমজান মুসলমানের জীবনে এক অনন্য নিয়ামত। যা তাঁকে আল্লাহভীতি অর্জনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভে সাহায্য করে। রমজান মাস আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। কেননা এই মাসে প্রতিটি আমলের সওয়াব বহুগুনে বৃদ্ধি করা হয়। তাই রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগানো প্রয়োজন।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদন জগত রমজানের পবিত্রতা ও রোজাদারের মহামূল্যবান সময় নীরবে ধ্বংস করে। অথচ মুমিন চাইলে আত্মসংযমের মাধ্যমে প্রযুক্তিকে ইবাদত-সহায়ক করতে পারেন।
বেশির ভাগ প্রযুক্তিই এমন যার ভালো ও মন্দ উভয় দিক আছে। ব্যবহারকারী চাইলে যেমন প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক কাজে লাগাতে পারেন, তেমনি তিনি চাইলে তা মন্দ কাজে ব্যবহার করতে পারেন। তাই সর্বপ্রথম প্রয়োজন ব্যক্তির আত্মসংযম। আর রমজান আত্মসংযম অর্জনের মাস। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে জান্নাতই হবে তাঁর আবাস।’ (সুরা নাজিয়াত, আয়াত : ৪০-৪১)
একজন মুসলমানের কাছে সময় অত্যন্ত মূল্যবান। ইসলাম সর্বদা সময়ের মূল্য দিতে শেখায়। মহান আল্লাহ নিজেই সময়ের শপথ করে সময়ের গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘শপথ মহাকালের! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আসর, আয়াত : ১-২)
আর রমজান মাসে সময়ের মূল্য আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কেননা একাধিক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে এই মাসে আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। পবিত্র এই মাসে আল্লাহ রহমতের দরজা উন্মুক্ত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৯৮)
রোজাদার ব্যক্তি চাইলে আধুনিক প্রযুক্তিকে ইবাদতের সহায়ক হিসেবেও গ্রহণ করতে পারেন। বর্তমানে মানুষ অনেক বেশি কর্মব্যস্ত। রমজানে অনেকের পক্ষে পৃথকভাবে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা সম্ভব হয় না। একজন কর্মব্যস্ত মানুষ চাইলে স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে কাজের ফাঁকে তিলাওয়াত করতে পারেন। বিশেষত চলাফেরার সময় যানবাহনে বসে। বর্তমানে অসংখ্য কোরআন অ্যাপ রয়েছে, যেখানে তিলাওয়াত, তাফসির, অনুবাদ ও তাজবিদসহ পড়ার সুযোগ আছে। যাঁরা শুদ্ধ তিলাওয়াত শিখতে চান তাঁরা বিখ্যাত কারিদের তিলাওয়াত শুনে অনুশীলন করতে পারেন।
রমজান মাসে মনীষীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা। একজন ব্যক্তি জ্ঞানের মজলিসে উপস্থিত না হয়েও মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাব ও ল্যাপটপে বসে ইসলামী বই-পুস্তক পড়তে পারেন। অনলাইনে ইসলামী সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব বই-ই পাওয়া যায়। রমজান মাসে সিরাত, সাহাবিদের জীবনী, ফিকহ ও আত্মশুদ্ধিমূলক বইগুলো পাঠ করলে ঈমান ও আমলের অনুপ্রেরণা লাভ করা যাবে।
একজন রোজাদার চাইলে ডিভাইসের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত স্কলারদের আলোচনা শুনতে পারেন। ইউটিউব, পডকাস্ট বা ইসলামী অ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বস্ত আলেমদের বক্তব্য শোনা যায়। অনেক আলেম রমজান মাসে সামাজিক মাধ্যমে লাইভ আলোচনা করেন। রান্না করার সময়, যাতায়াতের পথে কিংবা বিশ্রামের মুহূর্তে এসব আলোচনা শোনা যেতে পারে।
প্রযুক্তির সাহায্যে রমজানে সময়ের সঠিক পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গুগল প্লে স্টোরে ‘রামাদান প্ল্যানার’ নামে অনেক অ্যাপ পাওয়া যায়। এসব অ্যাপের মাধ্যমে ব্যক্তি তাঁর নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ইত্যাদি ইবাদতের সময় নির্ধারণ করতে পারেন এবং অ্যাপ নির্ধারিত সময়ে ব্যক্তিকে তা স্মরণও করিয়ে দেয়। এর ফলে রমজানের সময়গুলো আরো বেশি ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারে।
যাঁরা রমজান মাসেও আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাঁরা স্মার্ট ফোনের সেটিংসে গিয়ে ‘ডিজিটাল ওয়েলবেইং অ্যান্ড পার্সনাল কন্ট্রোলস’ অপশনের মাধ্যমে স্ক্রিন টাইম সীমিত করতে পারেন। এটা আত্মনিয়ন্ত্রণে সহায়ক। সম্ভব না হলে ইবাদতের সময় মোবাইল বন্ধ রাখাও যেতে পারে।
আসুন, রমজানে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি, প্রযুক্তি যেন আমাদের ইবাদত থেকে দূরে না সরায়, বরং তা আমাদের কোরআন, জ্ঞান ও আমলের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।