ঝালকাঠির নলছিটিতে ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে সুন্নতে খৎনা করানোর পর এক শিশু এখন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।
কাওছার হোসেন নামের ৭ বছর বয়সী ওই শিশুর বাড়ি নলছিটি উপজেলায় কুলকাঠি ইউনিয়নের পূর্ব পাওতা গ্রামে। সে পাওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে কাওছার হোসেনের বাবা-মা ছেলেকে নিয়ে নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুন্নতে খৎনা করতে যাওয়ার সময় বাইপাস মোড়ে ‘ডা. ফোরকান হোসেন’-এর সাইনবোর্ড তাদের দৃষ্টিগোচর হয়। তারা ফোরকান হোসেনের সঙ্গে কাওছারের খৎনা করানোর বিষয়ে কথা বলেন। ফোরকান বিকেলে আখড়পাড়া বাজারে তার শ্বশুর বেল্লাল হুজুরের ফার্মেসিতে আসতে বলেন। বিকেল ৫টায় মা-বাবা কাওছারকে নিয়ে ওই ফার্মেসিতে যান। সেখানে খৎনা করা হয়। এক দিন পরে কাওছারের যৌনাঙ্গে প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব হয় এবং প্রসাব বন্ধ হয়ে যায়। কাওছারের বাবা ফোরকানের কাছে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তাকে বাইপাস মোড়ে ফোরকানের ফার্মেসিতে যেতে বলা হয়। সেখানে কাওছারের বাবা আসলে তাকে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে বলা হয়, “এটা খাওয়ালে ভালো হয়ে যাবে।” ওই ওষুধ খাওয়ানের পরেও কোনো উন্নতি না হলে কাওছারের বাবা মোবাইল ফোনে আবার ফোরকানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু, ফোরকান আর কল রিসিভ করেননি।
কাওছারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১ মার্চ বিকেলে তাকে নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আরিফ মল্লিক। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পর্যবেক্ষণের জন্য কাওছারকে আধাঘণ্টা অক্সিজেন দিয়ে রাখেন। তাতেও কোনো উন্নতি দেখা না গেলে কাওছারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো। সেই হাসপাতালের চিকিৎসক কাওছারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। তবে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে পিজি হাসপাতালে পাঠান। পিজি হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক সিট সংকটের কথা বলে কাওছারকে ভর্তি করেননি। পরে ঢাকার তেজগাঁওয়ের বেসরকারি কিউর স্পেশালিস্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক অনুরোধের পর কাওছারকে সেখানে ভর্তি করা হয়।
কিউর স্পেশালিস্ট হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কাওছার বর্তমানে সঙ্কটজনক অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে। তার শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, সেপটিসেমিয়া, এনসেফালাইটিসসহ রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা মস্তিষ্কে পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছে।
কাওছারের বাবা সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমি গরিব মানুষ। আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে ভুয়া ডাক্তার ফোরকান এমন ঘৃণিত কাজ করেছে। এর বিচার চাই। সে ডাক্তার না হয়েও ডাক্তার পরিয়ে আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সমাজের সচেতন মহলের কাছে বিচার চাই। আমি এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য আরিফ মল্লিক বলেছেন, “ভুয়া ডাক্তার ফোরকানের নামে নলছিটি উপজেলায় এরকম অনেক অভিযোগ পেয়েছি। সে এর আগেও অনেকের সুন্নতে খৎনা করতে গিয়ে ভুল করেছে এবং জরিমানা দিয়েছে।”
স্থানীয়রা অভিযোগ বলেছেন, “ডাক্তার পরিচয় দিয়ে এ ধরনের কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অপরাধ।” তারা দ্রুত তদন্ত করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
ঝালকাঠি জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ন কবির বলেছেন, “এ ধরনের অপচিকিৎসা করার কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে কথা বলতে বাইপাস মোড়ে ফোরকানের ফার্মেসিতে গেলে সাংবাদিকদের দেখতে পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ করেননি ফোরকান।