লাইফস্টাইল

ইতিকাফ কেন করব, কীভাবে করব?

রমজানের শেষ দশকের গুরুত্বপূর্ণ আমল ইতিকাফ। ইতিকাফের শাব্দিক অর্থ অবস্থান করা, কোনো কিছু দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরা। শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ বলা হয়, পার্থিব কর্মকাণ্ড ত্যাগ করে ইবাদতের জন্য নিয়তের সঙ্গে মসজিদে অবস্থান করা। ইতিকাফ এমন তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত যা পূর্ববর্তী নবীদের যুগেও ছিল এবং তা মুসলমানদের জন্যও বহাল রাখা হয়েছে। 

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ইবরাহিম ও ইসমাইলকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখার আদেশ দিয়েছিলাম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)

এই আয়াত থেকে প্রমাণ হয়, তাওয়াফ ও নামাজের মতো পূর্ববর্তী শরিয়তে ইতিকাফেরও বিধান ছিল। ইসলামী শরিয়তে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নত। একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, মহানবী (সা.) প্রতিবছর রমজান মাসে ইতিকাফ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) প্রত্যেক রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। যে বছর তাঁর ইন্তেকাল হয়, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৪৪)

হাদিসে ইতিকাফ করার অনেক মর্যাদা ও পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন, সে নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং নেককার যাবতীয় নেকি তার জন্য লেখা হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৮১)

ইমাম জুহরি (রহ.) বলেন, ‘আশ্চর্য! মানুষ ইতিকাফের সুন্নত ছেড়ে দেয়। নবীজি (সা.) কিছু আমল করতেন এবং তা আবার ছেড়েও দিতেন। কিন্তু তিনি হিজরত করে মদিনায় আসার পর ইন্তেকাল পর্যন্ত নিয়মিত ইতিকাফ করেছেন। কখনো ছেড়ে দেননি।’ 

ইতিকাফরত অবস্থায় ব্যক্তি যে কোনো ইবাদত করতে পারবে। যেমন নামাজ পড়া, দান করা, কোরআন তিলাওয়াত করা, জিকির করা, কোরআন ও হাদিসের পাঠদান করা, ওয়াজ-নসিহত করা ও শোনা ইত্যাদি। ইতিকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ব্যক্তির মুসলিম হওয়া, হায়েজ ও নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া, জানাবাত (গোসল ফরজ হওয়া) মুক্ত হওয়া, নিয়ত করা এবং পুরুষের জন্য মসজিদ হওয়া আবশ্যক। নারীরা ঘরের নির্ধারিত স্থানে ইতিকাফের নিয়তে অবস্থান করবে।

ইতিকাফ কীভাবে করব

এখন প্রশ্ন হলো, ইতিকাফ কীভাবে করব? ইসলামী শরিয়তের নির্দেশনা অনুসারে ইতিকাফ করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান জেনে নেওয়া জরুরি। নিম্নে ইতিকাফ বিষয়ে কয়েক জরুরি মাসয়ালা তুলে ধরা হলো: 

১. প্রতিটি মহল্লার মসজিদে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে কেফায়া। যদি মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে একদল মানুষ ইতিকাফ করে তবে সবাই দায়মুক্ত হয়ে যাবে। আর যদি কেউ ইতিকাফ না করে তবে সবাই গুনাহগার হবে। এক মহল্লায় একাধিক মসজিদ থাকলে প্রত্যেক মসজিদে ইতিকাফ করা উত্তম, তবে তা জরুরি নয়।

২. ২০ রমজান সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে সুন্নত ইতিকাফ শুরু হয়। এজন্য ২০ রমজান সূর্য ডোবার আগেই ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করা জরুরি। নারীরা একই সময়ে ইতিকাফের জন্য নির্ধারিত স্থানে প্রবেশ করবে। কেউ যদি ২০ রমজান সূর্য ডোবার আগেই মসজিদে বা ইতিকাফের স্থানে প্রবেশ করতে না পারে সেটা সুন্নত ইতিকাফ বলে গণ্য হবে না, সেটা হবে নফল ইতিকাফ।

৩. যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করবে তার জন্য উত্তম হলো ঈদের নামাজ পড়ে ঘরে ফেরা। তবে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ইতিকাফের সময় শেষ হয়। সুতরাং সে চাইলে তখনি বের হয়ে যেতে পারবে। 

৪. যদি মসজিদের সীমানার ভেতর অজুর ব্যবস্থা থাকে তবে ইতিকাফকারী মসজিদ থেকে বের হবে না, নতুবা অজুর জন্য মসজিদের বাইরে যেতে পারবে।

৫. কেউ যদি অজু করার প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে যায় এবং অজু করার আগেই হাত-মুখ ধোয় বা হাত-মুখে সাবান ব্যবহার করে, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই। বিপরীতে শুধু হাত-মুখ ধোয়ার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়ার কিংবা অজু শেষ করার পর হাত-মুখ ধোয়ার অবকাশ নেই।

৬. যদি মসজিদের ভেতর গোসলের ব্যবস্থা না থাকে এবং মুতাকিফের ওপর গোসল ফরজ হলে মসজিদ থেকে বের হয়ে গোসল করা জরুরি। শরীরের গন্ধ হলেও গোসলের জন্য বের হতে পারবে। কিন্তু শুধু শরীর শীতল করার জন্য মসজিদের বাইরে গোসল করতে বাইরে যাবে না। 

৭. ইতিকাফ একটি ইবাদত। তাই তা স্বেচ্ছায় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পালন করা আবশ্যক। কাউকে টাকার বিনিময়ে ইতিকাফ করানো এবং তা করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এভাবে ইতিকাফ করানোর দ্বারা মহল্লাবাসী দায়মুক্ত হতে পারবে না।

৮. ইতিকাফরত ব্যক্তি উপকারী বই-পুস্তক পড়তে পারবে, বরং তা উত্তম।

৯. ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা নাজায়েজ নয়, যদি না তা কোনো হারাম কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার ইতিকাফের মাহাত্ম্য নষ্ট করতে পারে।  

যেসব কারণে ইতিকাফ নষ্ট হয়

১. প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ বা শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া মসজিদ থেকে বের হওয়া। ২. রোজা না রাখা বা ভেঙে ফেলা। ৩. ইতিকাফরত অবস্থায় নারীদের হায়েজ-নিফাস শুরু হলে। ৪. যে কোনো যৌনাচারে লপ্তি হওয়া।  ৫. মসজিদের এক তলা থেকে অন্য তলায় গেলে বা একাংশ থেকে অন্য অংশে গেলে ইতিকাফ নষ্ট হয় না।  ৬. ইতিকাফ অবস্থায় সিগারেট খাওয়া অত্যন্ত নিন্দনীয়। শুধু সিগারেট খেতে মসজিদের বাথরুমে গেলেও ইতিকাফ ভেঙে যাবে। ৭. কোনো কারণে ইতিকাফের স্থান থেকে বাইরে বের হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করা। ৮. ভুলে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেও ইতিকাফ ভেঙে যায়। সে ক্ষেত্রে এক দিনের ইতিকাফ কাজা করতে হবে।

তথ্যসূত্র : ফাতহুল কাদির : ২/৩৯৫; আল ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু : ৩/১৭৭৩; রদ্দুল মুহতার ২/৪৪২; আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৫১৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ২/১৫২।