লাইফস্টাইল

রমজানে দাম্পত্য সম্পর্কের সীমারেখা

সুস্থ, সাবালক ও মুসাফির নয়, এমন মুসলিম নর-নারীর ওপর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। ফরজ বিধান রোজা পালনের পদ্ধতি তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য রোজার রাতে স্ত্রী-সম্ভোগ বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।... সুতরাং এখন তোমরা তাদের সঙ্গে সংগত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন তা কামনা করো। আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাতের কৃষ্ণরেখা থেকে ঊষার শুভ্র রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের কাছে প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত আসা পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো। তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের সঙ্গে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

উল্লিখিত আয়াতের আলোকে ফকিহ আলেমরা বলেন, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় ও স্ত্রী-সম্ভোগ পরিত্যাগ করার নাম রোজা। আয়াত থেকে এটাও প্রমাণ হয় যে, রমজান মাসে রাতের বেলা স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতে কোনো বাধা নেই। কেউ যদি রমজানের রাতে সুবহে সাদিকের আগে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং ফরজ গোসল সুবহে সাদিকের পরে করে তবে তার রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। তবে উত্তম হলো, ফরজ গোসলে বিলম্ব না করা। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১/২০৭)

রমজান মাসে সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম। এতে রোজা ভেঙে যায়। কেউ এমন করলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য রোজার কাজা আদায় ও কাফফারা প্রদান করা আবশ্যক। কিন্তু কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে সহবাসে বাধ্য করে, তবে স্ত্রী শুধু রোজা কাজা করবে এবং স্বামীর কাজা-কাফফারা দুটোই করবে। রোজার কাজা হলো রোজার পরিবর্তে রোজা রাখা এবং কাফফারা হলো একজন দাস মুক্ত করা, সেটা সম্ভব না হলে ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোজা রাখা। আর তাও সম্ভব না হলে ৬০ জন মিসকিনকে মধ্যমানের খাবার খাওয়ানো। (দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম, পৃষ্ঠা-৩০৭)

রোজা রাখা অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী যদি আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী না হয়, তবে তাদের জন্য চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করা এবং যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা মাকরুহ। আর যদি নিজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে তবে চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করা এবং একই বিছানায় ঘুমালে কোনো সমস্যা নেই। (ফতোয়ায়ে শামি : ২/৪১৭)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবীজীর (সা.) কাছে রোজা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর অন্য এক ব্যক্তি এসে অনুরূপ জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে নিষেধ করে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যাকে অনুমতি দিয়েছেন সে ছিল বৃদ্ধ এবং যাকে নিষেধ করেছেন সে ছিল যুবক। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৮৭)

রোজা রাখা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী (সহবাস ছাড়া) ঘনিষ্ঠ হয়, তারা চুমু খায়, আলিঙ্গন করে এবং বীর্যপাত হয়ে যায়, তবে যার বীর্যপাত হয়েছে তার রোজা ভেঙে যাবে। তখন ব্যক্তির জন্য রোজার কাজা করা আবশ্যক হবে। তবে কাফফারা দিতে হবে না। রোজা রেখে ব্যক্তির জন্য গভীর চুম্বন সর্বাবস্থায় মাকরুহ। তা হলো ঠোঁটের ভেতর ঠোঁট নিয়ে চুম্বন করা। একইভাবে একে অপরের লজ্জাস্থান স্পর্শ করা এবং লজ্জাস্থানের সঙ্গে লজ্জাস্থান ঘর্ষণ করাও সর্বাবস্থায় মাকরুহ। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১/২০০)

উত্তম হলো, রমজান মাসে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে সব ধরনের ঘনিষ্ঠতা পরিহার করবে। কেননা হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ শাহওয়াত (কামপ্রবৃত্তি) পরিহারকারীর প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানবসন্তানের প্রতিটি আমল তার জন্য, কেবল রোজা আমার জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেই। নিশ্চয়ই সে আমার জন্য খাবার, পানীয় ও কামপ্রবৃত্তি পরিহার করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৯৪)

ইসলাম রমজান মাসে কামপ্রবৃত্তির বাইরে গিয়ে দাম্পত্য জীবনের ভিন্ন মাত্রা প্রদানের নির্দেশনা দেয়। তা হলো, স্বামী ও স্ত্রী রমজান মাসে দিনের বেলা সব ধরনের যৌনতা পরিহার করে সঙ্গীকে এটা বোঝাবে যে, যৌনতাই আমাদের সম্পর্কের সবটুকু নয়। এই বাইরেও ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও আকাঙ্ক্ষার নানা দিক আছে। 

রমজান মাসে আদর্শ দম্পতি পরস্পরকে নেক কাজে সহযোগিতা করবে। যেমনটি আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসত তখন নবী (সা.) তাঁর লুঙ্গি কষে বেঁধে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২৪)

অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলায় স্বীয় স্ত্রীকে সজাগ করে উভয়ে কিংবা প্রত্যেকে দুই দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণকারী ও স্মরণকারিণীর তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৩০৯)

আল্লাহ সবাইকে রমজান মাসে সংযত জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।