ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের বাক বদল শুরু হয়েছিল ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল বাংলাদেশ। এরপর সাফল্যের ঘোড়া ছুটতে থাকে। বিশ্বকাপের পর ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়।
এরপর ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানকে সিরিজ হারায় বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডকেও প্রায় বাগিয়ে এনেছিল। পরে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারে। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল তা টিকে ছিল পরেও। ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ খেলে সেমিফাইনাল। বাংলাদেশ ক্রিকেট হয়ে উঠে ওয়ানডেতে নতুন পরাশক্তি। কিন্তু সময়ের স্রোতে নিজেদের পেছনে পড়া সুসময়কেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ।
অতীতের সুসময় হারিয়ে গেছে অতলে। নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের ফরম্যাটেই বাংলাদেশ এখন ব্যর্থতার মোড়কে আটকানো। ওয়ানডে ক্রিকেটে যে তেজ ছিল, বলে কয়ে প্রতিপক্ষকে হারাতে পারত তা এখন নেই। তবে অতীতের সেই ব্র্যান্ড অব ক্রিকেটেই বাংলাদেশের বর্তমান ওয়ানডে অধিনায়কের মন কাটকানো। সেই ব্র্যান্ডকেই বর্তমানে নিজেদের খেলায় আয়ত্বে করার চেষ্টায় মিরাজ অ্যান্ড কোং।
পাকিস্তানের বিপক্ষে আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে হোম সিরিজ। এই সিরিজ দিয়ে বাংলাদেশের সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার মিশনও শুরু হচ্ছে। ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে র্যাংকিংয়ের সেরা আট দলের মধ্যে থাকতে হবে। ১৪ দলের এই আসরে বাকি দলগুলোকে খেলতে হবে বাছাইপর্ব।
২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে ছাড়াও র্যাংকিংয়ের সেরা আট দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। সামনের এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মিরাজ, ‘‘হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন—আমাদের অবশ্যই একটি লক্ষ্য আছে। সামনে যেহেতু ওয়ানডে বিশ্বকাপ রয়েছে, তাই এখন থেকেই সেই পথচলা শুরু করতে হবে। আমরা সেটি মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করছি। এক সময় ওয়ানডে ফরম্যাটটা আমাদের জন্য খুব ভালো একটি জায়গা ছিল। এই ফরম্যাটে আমরা অনেক ভালো ফলও পেয়েছি এবং আমাদের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ছিল। তখন দলে অনেক অভিজ্ঞ সিনিয়র খেলোয়াড় ছিলেন। তারা দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলায় সেই প্যাটার্নটা খুব ভালোভাবে বুঝে নিতে পেরেছিলেন।’’
‘‘তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, কারণ তাদের অনেকেই আর দলে নেই। তাই বর্তমানে যারা দলে আছে, তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। আমার কাছে মনে হয়, ওয়ানডে ক্রিকেট এমন একটি ফরম্যাট যেখানে প্রতিটি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে জানতে হয়। কোন পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, সেটা প্রতিটি খেলোয়াড়েরই জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, প্রত্যেক পজিশনে কীভাবে খেলতে হবে—সেটাও বোঝা দরকার। বিশেষ করে ব্যাটসম্যানদের আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। সব মিলিয়ে আমরা সেভাবেই পরিকল্পনা করছি এবং যেহেতু আমাদের নতুন করে শুরু হচ্ছে, তাই সামনে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় সেটাই এখন আমাদের মূল ভাবনা ‘’ – যোগ করেন তিনি।
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ সরাসরি খেলতে হলে বাংলাদেশকে কঠিন চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হবে। সেই মিশন শুরু হচ্ছে বুধবার থেকে। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথশ ওয়ানডে ২টা ১৫ মিনিটে। আইসিসি-এর শর্ত পূরণ করে ২০১৫, ২০১৯ ও ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দীর্ঘ সময় ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের ৭ নম্বরে থাকা দলটি এখন নেমে গেছে ১০ নম্বরে। রেটিং পয়েন্ট ৭৬। সরাসরি বিশ্বকাপ খেলতে আত্মবিশ্বসী মিরাজ, ‘‘দেখুন, এ বছর আমাদের অনেক বেশি ওয়ানডে ম্যাচ রয়েছে। আগেও বলেছি, ২০২৩ সালের বিশ্বকাপের পর আমরা খুব বেশি ওয়ানডে খেলিনি। যেগুলো খেলেছি, সেগুলোও অনেক বিরতি দিয়ে হয়েছে—যেটা আমাদের জন্য কিছুটা কঠিন ছিল।’’
‘‘তবে এ বছর যেহেতু আমাদের অনেক বেশি ওয়ানডে ম্যাচ আছে, তাই পরিকল্পনাটা আরও ভালোভাবে করার সুযোগ থাকবে। র্যাঙ্কিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমার কাছে মনে হয় প্রতিটি সিরিজই আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি প্রতিটি ম্যাচও।’’
‘‘আমরা শেষ যে সিরিজটা জিতেছি, আর কাল থেকে যে নতুন সিরিজ শুরু হচ্ছে এবং সামনে যে সিরিজগুলো আছে—সবগুলোই আমাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সেই ভাবনাতেই পরিকল্পনা করছি। খুব বেশি দূরের কথা না ভেবে আপাতত সিরিজ ধরে এবং ম্যাচ বাই ম্যাচ এগোতে চাই। দিনের শেষে আশা করি এতে করে ভালো ফলই আসবে।’’
মিরাজের বিশ্বাস, নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে এই দল নিয়ে অনেকদূর যাওয়া সম্ভব, ‘‘দেখুন, একটি দল গড়ে তুলতে হলে প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই পারফরম্যান্স করা জরুরি। অধিনায়ক হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো প্রতিটি খেলোয়াড়কে সমর্থন দেওয়া এবং তাদের পাশে থাকা। আমার বিশ্বাস, আমাদের দলে অনেক ভালো এবং সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় আছে। আমরা অবশ্যই তাদের সমর্থন করার চেষ্টা করব। তারা যদি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারে, তাহলে সেটা দলের জন্যই সবচেয়ে ভালো হবে।’’
মিরাজ কথা দিয়েছেন দল কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের দুঃসময়ে তাকে পাশে পাবেন. ‘‘আমার কাছে মনে হয়, প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য পারফরম্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবাই যদি নিজের দায়িত্বটা বুঝে নেয় এবং যারা ভালো করছে তারা যদি নিয়মিতভাবে দলে অবদান রাখে, তাহলে সেটি দলের জন্য অনেক ইতিবাচক হবে।’’
‘‘তবে ক্রিকেটে এমন সময়ও আসে যখন ভালো খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও কেউ হয়তো প্রত্যাশামতো পারফর্ম করতে পারে না। সেই সময় একজন অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব হলো তাকে সমর্থন দেওয়া এবং তার ওপর আস্থা রাখা। আমরা অবশ্যই এই বিষয়টিও মাথায় রাখব।’’ – বলেছেন মিরাজ।
প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে হালকাভাবে নিচ্ছে না বাংলাদেশ, ‘‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে প্রতিটি দলই শক্তিশালী। হ্যাঁ, তাদের দলে বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড় এসেছে, আর তারা নিশ্চয়ই পারফর্ম করেই দলে জায়গা পেয়েছে। তবে আমাদের একটি সুবিধা অবশ্যই থাকবে—আমরা ঘরের মাঠে খেলছি এবং নিজেদের কন্ডিশন সম্পর্কে খুব ভালো জানি। আমার মনে হয়, সবাইকে নিজের দায়িত্বটা বুঝে খেলতে হবে। আর প্রতিপক্ষকে আমরা অবশ্যই যথাযথ সম্মান দিই।’’