সারা বাংলা

ফুটপাতই ভরসা নিম্ন আয়ের মানুষের

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরের আর মাত্র নয় দিন বাকি। ঈদকে সামনে রেখে কুমিল্লা নগরীতে জমে উঠেছে কেনাকাটা। অভিজাত শপিংমলগুলোতে যেখানে উচ্চবিত্তদের ভিড়, সেখানে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ঈদ মার্কেট এখন শহরের ফুটপাতজুড়ে। সাধ্যের মধ্যে নতুন পোশাক কিনে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় তারা ভরসা রাখছেন রাস্তার পাশের অস্থায়ী ও ভাসমান দোকানগুলোর ওপর।

ঈদের আগে চাকরিজীবীরা হাতে পাচ্ছেন বেতন ও বোনাস। বিভিন্ন পেশার মানুষও সারা বছর কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখেন। সেই অর্থ দিয়েই পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামাকাপড় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনছেন তারা। তবে, বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকের পক্ষেই বড় মার্কেটে কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, ফুটপাতের স্বল্পমূল্যের কাপড় ও পণ্যের দোকানগুলোই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান গন্তব্য।

নগরীর কান্দিরপাড়, নিউ মার্কেট, লিবার্টি মোড়, মনোহরপুর ও রাজগঞ্জ সড়কের দুই পাশজুড়ে এখন সারি সারি অস্থায়ী দোকান। শিশুদের ফ্রক, পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, সালোয়ার-কামিজ, জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট থেকে শুরু করে টুপি, আতর ও জায়নামাজ পর্যন্ত মিলছে হাতের নাগালে। কম দামে পছন্দের জিনিস পেয়ে খুশি ক্রেতারা। বিক্রেতারাও সন্তুষ্ট বেচাবিক্রি নিয়ে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বিকেলে নগরীর বিভিন্ন ফুটপাতে গিয়ে দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। অনেক জায়গায় পা ফেলার জায়গা নেই। সন্ধ্যার পর বিশেষ করে নিউ মার্কেট এলাকায় মানুষের ঢল নামে। ছুটির দিনে ভিড় আরো বেশি হয়। টুপি, আতর ও জায়নামাজের দোকানগুলোতেও মুসল্লিদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে।

লিবার্টি মোড়ে কাপড় কিনতে আসা দিনমজুর আবদুল হক বলেন, “বড় দোকান থেকে কাপড় কেনার সামর্থ আমাদের নেই। এখানে কম দামে ভালো কাপড় পাওয়া যায় বলেই পরিবারের সবার জন্য নতুন জামা কিনতে পারছি।”

শহরের একটি মুদি দোকানের কর্মচারী আবুল কাশেম জানান, মাত্র ৩ হাজার টাকার মধ্যেই স্ত্রী ও সন্তানদের ঈদের সব কেনাকাটা শেষ করেছেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা নতুন জামা পেয়ে খুশি, সেটাই তার বড় আনন্দ।

সমবায় মার্কেটের সামনে ফুটপাতে ব্যবসা করা রহিম মিয়া বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে বিক্রি বেশ ভালো। বিশেষ করে, শিশুদের পোশাকের চাহিদা বেশি। ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে শিশুদের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। নারীদের সালোয়ার-কামিজ, ছেলেদের শার্ট-প্যান্ট ও পাঞ্জাবিও হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।”

ভ্যানে করে শিশুদের পোশাক বিক্রি করা ইয়াছিন মিয়া জানান, তার ক্রেতাদের বড় অংশ দিনমজুর, রিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার নিম্নআয়ের মানুষ। তবে, মধ্যবিত্তরাও আসছেন। অনেকের আয় সীমিত হওয়ায় বড় মার্কেটের দাম তাদের নাগালের বাইরে। তাই, তারা ফুটপাতেই ভরসা খুঁজে পান।

রিকশাচালক নূরুল হক বলেন, “আমাদের ঈদ মার্কেট মানেই ফুটপাত। এর বাইরে কেনাকাটা করার সামর্থ নেই। তবু, এখান থেকে যা পাই, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি।”

অশোকতলা এলাকার গৃহিণী রেহানা আক্তার ১ হাজার ৫০০ টাকায় তিন মেয়ের জন্য কাপড় কিনেছেন। তিনি বলেন, “আগে মেয়েদেরটা কিনলাম, এখন নিজের জন্য দেখব। ঈদে সবার মুখে হাসি দেখাই আসল বিষয়।”

ফুটপাতের এসব দোকানে শুধু পোশাক নয়, কম দামি গহনা, প্রসাধন সামগ্রী, জুতা, ব্যাগসহ নানা সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির চাপে যেখানে বড় বিপণিবিতানে কেনাকাটা অনেকের নাগালের বাইরে, সেখানে ফুটপাতের এই অস্থায়ী বাজারগুলোই হয়ে উঠেছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদ আনন্দের প্রধান অবলম্বন। সীমিত সামর্থের মধ্যেও প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর এই চেষ্টাই যেন ফুটপাতজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভিন্ন এক ঈদের আমেজ।