সাতসতেরো

ব্যবসায়িক পণ্যের জাকাতের হিসাব যেভাবে করবেন

জাকাত ইসলামের অন্যতম ফরজ বিধান ও স্তম্ভ। রমজান মাসে অধিক সওয়াব লাভের জন্য অনেকেই সম্পদের জাকাত প্রদান করে থাকেন। সাধারণ সম্পদে জাকাতের হিসাব হলো ব্যক্তি তার জাকাতযোগ্য সম্পদের ৪০ ভাগের একভাগ জাকাত প্রদান করবে। অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা। কিন্তু জাকাতের হিসাব করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যান। কেননা ব্যবসায় সম্পদের প্রবাহ চলমান। এতে প্রতি মুহূর্তে সংযোজন ও বিয়োজন হতে থাকে। এজন্য ব্যবসায়ী পণ্য বা সম্পদের জাকাতের হিসাব কীভাবে করা হবে  তুলে ধরা হলো।

প্রথমে জানতে হবে, ব্যবসায়ী সম্পদে জাকাত দেওয়া জরুরি কি না? উত্তর হলো, অন্যান্য সম্পদের মতো ব্যবসায়ী সম্পদে জাকাত দেওয়া জরুরি এবং এ বিষয়ে উম্মতের আলেমরা একমত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ব্যয় কোরো উত্তম বস্তু, তোমরা যা অর্জন করেছ এবং আমরা জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৭)

আয়াতে উলি্লখিত, ‘তোমরা যা অর্জন করেছ’ বাক্যের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন, ‘তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে যা অর্জন করেছ।’ (তাফসিরে তাবারি : ৫/৫৫৮)

সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, ‘ব্যবসায়ের জন্য প্রস্তুতকৃত সম্পদ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জাকাত আদায় করার নির্দেশ দিতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৬২)

এরপর জানতে হবে ব্যবসায়িক সম্পদ কাকে বলে? ফকিহ আলেমরা বলেন, যেসব সম্পদ বিদেশে থেকে আমদানি বা বিদেশে রপ্তানি বা স্থানীয় বাজারে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়-বিক্রয় করা হয় তাকে ব্যবসায়িক পণ্য বলে। ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত সব ধরণের সম্পদই ব্যবসায়িক সম্পদ হতে পারে। যেমন জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি, খাদ্যদ্রব্য, কৃষিপণ্য, চতুষ্পদ প্রাণী, যন্ত্রপাতি, গাড়ি ইত্যাদি। এসব সম্পদ একক মালিকানাধীন হতে পারে বা একাধিক মালিকানাভুক্ত হতে পারে। 

ব্যবসা করার সময় অনেকেই পরস্পরের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন এবং ঋণ প্রদানও করেন। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো, ব্যবসায়ীর ঋণের অর্থ যদি অন্যের কাছে থাকে এবং সে যখন ইচ্ছা তা আদায় করতে সক্ষম হয় তবে উক্ত সম্পদ তার নগদ অর্থ বা ব্যবসায়িক সম্পদের সাথে মিলিয়ে জাকাত আদায় করবে; যদি তাতে এক বছর পূর্ণ হয়। যদি ব্যবসায়ীর কাছে ঋণের অর্থ ব্যতীত অন্য সম্পদ না থাকে এবং ঋণের সম্পদ নিসাব পরিমাণ হয় এবং উক্ত অর্থ যে কোনো সময় আদায় করতে সক্ষম হয় তবে তা থেকেও জাকাত আদায় করতে হবে। 

অন্যদিকে জাকাতদাতার ঋণের অর্থ যদি নিঃস্ব-দরিদ্র বা ঋণ অস্বীকারকারীর কাছে থাকে, সহজে উক্ত অর্থ আদায় করতে সক্ষম না হয় তবে যখন উক্ত অর্থ আদায় করতে সক্ষম হবে, তখন শুধু সে বছরের জাকাত আদায় করবে। বিগত বছরের জাকাত আদায় করতে হবে না। যদিও অনেক বছর অতিবাহিত হয়।

ব্যবসায়িক সম্পদের জাকাতের পরিমাণ সোনা-রুপার জাকাতের পরিমাণের মতোই। কারো কাছে সোনা বা রুপার হিসাবের পরিমাণ ব্যবসায়িক সম্পদ থাকলে এবং তা একবছর অতিবাহিত হলে বছর শেষে তাতে শতকরা আড়াই শতাংশ জাকাত ফরজ হবে। ব্যবসায়ী সোনা বা রুপা যে কোনো একটির হিসাব করে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে। 

ব্যবসায়ী নিজের হিসাবের জন্য সহজ এমন একটি সময়কে জাকাত হিসাবের জন্য বেছে নিতে পারেন। তার নির্ধারিত জাকাতের বছর পূর্ণ হলে পূর্বোক্ত নিয়মানুসারে যেগুলো ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ধর্তব্য সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করবে। অতঃপর এই অর্থ তার নগদ অর্থের সাথে একত্রিত করবে, অতঃপর এর সঙ্গে ঋণের যে অর্থ সহজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা যোগ করবে। অতঃপর ব্যবসায়ীর ওপর এক বা একাধিক ব্যক্তির ঋণ থাকলে সে অর্থ বিয়োগ করবে। অতঃপর অবশষ্টি অর্থের জাকাত আদায় করবে।

ব্যবসায়ী তার ব্যবসার পণ্যের বর্তমান বাজারদর নির্ধারণ করবেন। এতে বর্তমান বাজারদর তার ক্রয়মূল্যের বেশি হোক বা কম হোক সেটা ধর্তব্য হবে না। বর্তমান বাজারদর বলতে জাকাত ফরজ হওয়ার সময় উক্ত পণ্যটির বাজারে বিক্রয়মূল্য।

যে সম্পদ অর্জন করা অথবা যে সম্পদ থেকে উপকার লাভ শরিয়তে নিষদ্ধি তা হারাম সম্পদ। হারাম সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ নয়। কেননা এ ধরনের সম্পদে ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না, যা জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত। হারাম কাজের মজুরি হিসেবে অর্জিত সম্পদ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে দেবে। যার কাছ থেকে তা নিয়েছে তাকে ফেরত দেবে না। কেননা সে তা আবারও গুনাহের কাজে ব্যয় করবে।

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।