সাক্ষাৎকার

‘এ বছর আমরা প্রায় ৭৫ শতাংশ বিক্রয় হারিয়েছি’

কামরুল হাসান শায়ক পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ। পাঠকের প্রত্যাশা পূরণে ফিকশন, নন-ফিকশন, ফ্যান্টাসি, সায়েন্স ফিকশন, হরর, কমিক্স, অটোবায়োগ্রাফি, অনুবাদ ইত্যাদি বই নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি দেশের প্রকাশনাকে সমষ্টিগতভাবে বিশ্বমানে উন্নীত করে আন্তর্জাতিক প্রকাশনাপ্রবাহে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। যে কারণে দেশের প্রকাশনা শিল্পের সম্ভাবনা ও সংকট তার জানা। এসব সংকট সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নানা উপায় নিয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্বরলিপি।  

রাইজিংবিডি: বইমেলায় অংশগ্রহণ করবেন না- সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর একেবারে শেষ সময়ের সিদ্ধান্তে অংশ নিলেন। শেষ মুহূর্তে মেলায় প্যাভিলিয়ন থাকা না থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল; বাংলা একাডেমি শেষ পর্যন্ত আপনাদের শর্ত মেনে নিয়েছে, কিন্তু মেলার সময় পেছায়নি; যেটা আপনাদের দাবি ছিল। পুরো ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখছেন?

কামরুল হাসান শায়ক: অমর একুশে বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা, অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসব। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী বই উৎসব এটি। প্রকাশকদের কাছে বই বিপণনের এক অনিবার্য অংশও অমর একুশে বইমেলা। তাই প্রকাশক হিসেবে এতে অংশগ্রহণ করা সবার কাছেই অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়। কিন্তু আমরা মূলধারার প্রকাশকরা সবসময় একটি সফল, সমৃদ্ধ বইমেলা জাতিকে উপহার দিতে চেয়েছি। সফল বইমেলার জন্য যে রসায়ন প্রয়োজন, বিশেষ করে অমর একুশে বইমেলার ক্ষেত্রে, সেটি বাস্তবায়নে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবং বইমেলা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আমাদের ব্যাটে-বলে মিলছিল না। এ কারণে কমিটির অন্তর্ভুক্ত বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশক কমিটির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আমাদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হন।

অবশেষে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রীর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের মেলার তারিখ পরিবর্তনের মূল দাবি উপেক্ষিত রেখেই মেলায় অংশগ্রহণ করি। আজ মেলার শেষ সময়ে এসে এটা প্রমাণিত হলো—আমাদের পরামর্শ বলুন আর দাবি-ই বলুন, সেটাই সর্বৈব সঠিক ছিল। একুশে বইমেলা এবার সুপার ফ্লপ করল, আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত বাঙালির প্রাণের উৎসবটির যে কত বড় সর্বনাশ করলাম—এর দায় কার, তা আপনারাই বিচার করুন।

অমর একুশে বইমেলা মূলত আমাদের প্রকাশকদের অর্জন। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী এবং বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চট ও খবরের কাগজ বিছিয়ে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই নিয়ে প্রথম অমর একুশে বইমেলার সূত্রপাত করেন। সেই থেকে আজ ৫৫ বছরে পদার্পণ করা একুশে বইমেলার এই করুণ চিত্র দেখে আমরা প্রকাশকরা নিদারুণ মর্মাহত। যে বইমেলা বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক উৎসবের এক মহিরুহে পরিণত হয়েছিল, তা আজ দক্ষ নেতৃত্বের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

অমর একুশে বইমেলাকে আবারও তার স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে মেধাবী ও দক্ষ সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকের ত্রিমুখী ধারাকে এক মোহনার ঐক্যতানে বাজাতে বাস্তবসম্মত গবেষণা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে সমন্বিতভাবে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

রাইজিংবিডি: ‘পাঞ্জেরী’র বইমেলার আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাই। কোন ধরনের বই প্রকাশে এ বছর বেশি জোর দিচ্ছেন? এই যে বইমেলা নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে গেল— বই বিক্রিতে এর প্রভাব কেমন?

কামরুল হাসান শায়ক: এ-বছর পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. ১১৮টি বিভিন্ন শিরোনামে বৈচিত্র্যময় বই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় প্রায় সব জনরার বই। যেমন—মিস্ট্রি/থ্রিলার, ফ্যান্টাসি, হরর, সায়েন্স ফিকশন, মুক্তিযুদ্ধ, ইয়াং অ্যাডাল্ট, নন-ফিকশন, কমিকস, গ্রাফিক নভেল, কবিতা ও প্রবন্ধ।

একুশের বইমেলা প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই হওয়া উচিত। এর ব্যত্যয় ঘটায় এ বছর আমরা প্রায় ৭৫ শতাংশ বিক্রয় হারিয়েছি। এ- বছর মেলায় পাঠকের তেমন সাড়া নেই। এটি পুরো প্রকাশনা সেক্টর, অমর একুশে বইমেলা, বাংলা একাডেমি এবং আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের জন্য এক ভয়াবহ অশনি সংকেত। এখানে পাঠককে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং কীভাবে মানুষকে বইমুখী করে সমৃদ্ধ, মননশীল, মেধাবী জাতি বিনির্মাণ করা যায়—সেই বিষয়ে একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখা তৈরি এবং তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়া খুব প্রয়োজন। কিন্তু তার আগে জানা প্রয়োজন এই মহাসংকটের কারণ। আপাতত আমার দৃষ্টিতে যেসব কারণে এবার একুশে বইমেলায় আমরা পাঠক সমাগম হারিয়েছি, তার সংক্ষিপ্ত সারমর্ম হলো—

১. অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলেছে। এতে পাঠক নিদারুণ হতাশ হয়েছেন। লেখক পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করবেন কি করবেন না, প্রকাশক বই প্রকাশ করবেন কি করবেন না—বা করলেও কতটা সীমিত পরিসরে করবেন—এসব অনিশ্চয়তা মিলিয়ে পাঠক-লেখক-প্রকাশকের মধ্যে এক পানসে রসায়ন তৈরি হয়েছে এবং বইমেলা নিয়ে একটি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়েছে।

২. রমজানের প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই পাঠক ধীরে ধীরে ঈদের বাজারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। দ্বিতীয় সপ্তাহে পুরোপুরি ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে বাজেটও প্রায় পুরোপুরি ঈদের কেনাকাটার জন্য বরাদ্দ হয়ে যায়।

৩. আমরা বাংলাদেশের মানুষ কয়েক বছর ধরে বহুমাত্রিক কারণে এক অস্থির সময় পার করছি। এই সময় আমাদের প্রজন্মকে সুস্থ, মননশীল সংস্কৃতি থেকে বিমুখতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বই পড়ার ক্ষেত্রেও। এই বইবিমুখতা থেকে প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সৃজনশীল, মেধাবী জাতি বিনির্মাণের স্বার্থেই এই উদ্যোগ অনতিবিলম্বে নেওয়া উচিত।

লোক দেখানো বইপড়া আন্দোলন নয়, বরং নিবিড় গবেষণাপ্রসূত এমন জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়—অর্থাৎ কর্মসূচি হতে হবে রেজাল্ট ও টার্গেট-অরিয়েন্টেড।

৪. সর্বশেষ বিষয়টি হলো—লেখক ও প্রকাশকের দায়বদ্ধতা এবং পেশাদারিত্ব। আমরা অধিকাংশ লেখক ও প্রকাশক আমাদের পেশার প্রতি দায়িত্বশীল নই। বাংলাদেশে পেশাদার লেখক নেই বললেই চলে। আমাদের সমাজ কাঠামোও সেভাবে রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারেনি। যার ফলে পাঠক ভালো কনটেন্টের ভালো বই থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঠকতে ঠকতেই পাঠক ক্রমশ বইবিমুখ হয়ে পড়ছেন।

একজন পাঠকের হাতের মুঠোয় এখন পুরো পৃথিবী। ইচ্ছে করলেই পৃথিবীর সেরা বইগুলো যখন-তখন পড়ার সুযোগ রয়েছে। পাঠক এখন তুলনা করে বই পড়ার জায়গায় চলে গেছেন। অর্থাৎ আজ বাংলাদেশের একজন লেখক যে জনরার বইই লিখুন না কেন, তাকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসে একই জনরায় লেখা অন্য লেখকদের সঙ্গে।

একইভাবে প্রকাশককেও লেখকের সঙ্গে লিখিত চুক্তিপত্র করে পাণ্ডুলিপি যথাযথ সম্পাদনা করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রকাশ করতে হবে এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে বইটির দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিপণন কার্যক্রম নিশ্চিত করে সর্বাধিক পাঠকের কাছে বইটির বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অধিকাংশ লেখক ও প্রকাশকই আমাদের করণীয় কাজগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে করছি না। বরং সহজ ও দ্রুত উপায়ে নামীদামি লেখক বা প্রকাশক হওয়ার পথে হাঁটছি। অথচ এই সৃজনশীল পথ অত্যন্ত বন্ধুর ও চ্যালেঞ্জিং। অনেক গবেষণা, সাধনা এবং দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়—এর কোনো বিকল্প নেই।

প্রকাশনা কতোটা চ্যালেঞ্জিং তার নমুনা একটু উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করি। ধরা যাক ইয়াং অ্যাডাল্টদের জন্য একজন লেখক একটি বইয়ের পান্ডুলিপি প্রস্তুতের পরিকল্পনা করলেন। আজকের বিশ্ববাস্তবতায় লেখককে কী কী বিষয় বিবেচনায় নেয়া জরুরি, এটা লেখক নিজেই গবেষণা করবেন। কারণ, তাকে মনে রাখতে হবে, বিশ্ববাজারে এই জনরার আরও বই রয়েছে। সেইসব বইয়ের মানদণ্ড মাথায় রেখেই লেখার চ্যালেঞ্জটা তাকে নিতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে আমি মনে করি, প্রথমেই লেখক বিবেচনায় নিবেন Y/Aএর Key Genres and Trends. তারপর কোন জনরায় তিনি বেশি কনফিডেন্ট সেরা লেখাটি তৈরি করার জন্য। যেমন- Y/A এর সাম্প্রতিক ট্রেন্ডে জনপ্রিয় জনরাগুলো হচ্ছে - Dystopian, Fantasy, Magic realism, Contemporary realism, Thriller mystery এবং Si-Fi. এখন ধরুন লেখক চিন্তা করলেন তিনি ইয়াং অ্যাডাল্টদের জন্য Fantasy / Magic realism লিখবেন। তাহলে তাঁর ভাবনায় অবশ্যই J.K Rowling এর Harry Potter- কে মানদণ্ড বা তার কাছাকাছি মানের একটা পান্ডুলিপি তৈরি করার মতো মেধা, যোগ্যতা, সাধনা এবং পরিশ্রম করার মানসিক চ্যালেঞ্জিং দৃঢ়তা থাকা দরকার। আবার যদি কোন লেখক Contemporary realism লিখবেন বলে পরিকল্পনা করে থাকেন তাহলে অন্তত Angie Thomas এর The Hate You Give বইয়ের মানদণ্ডের মতো করে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করার যে চ্যালেঞ্জ, সেটা নেয়া প্রয়োজন। 

রাইজিংবিডি: প্রকাশনাশিল্পের বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে বর্ণনা করবেন?

কামরুল হাসান শায়ক: প্রকাশনা শিল্প আজ এক ভয়াবহ সংকটে। এর উত্তরণে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ আজ অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই উপযুক্ত তথ্য উপাত্ত এবং গবেষণা ছাড়াই হয়তো দাবি করবেন- সারা পৃথিবীতেই বইয়ের পাঠক কমছে। প্রকৃতপক্ষে এ দাবি মোটেও সঠিক নয়। এ বিষয়ে আমেরিকান টাইম ইউজ তাদের বিশ বছরের (২০০৩-২০২৩) স্টাডি সার্ভেতে দেখিয়েছে মানুষের মুদ্রিত বই পড়ার হার এই সময় ১০ শতাংশ কমে গেলে ডিজিটাল বইয়ের পাঠক বেড়েছে কয়েকগুণ। রিপোর্টটির প্রকাশকাল ২০২৫। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বইয়ের পাঠক বাড়ছে, এবং এটা বাড়বেই।

খুব দূরে নয়, এইতো সেদিন পাশের দেশে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা-২০২৬ সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে এলাম। আয়োজনের সেকি মহাযজ্ঞ, কী সমৃদ্ধি, কী জৌলুস! তাদের পরিসংখ্যান বলছে- তাদের পাঠক উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়ে চলছে, বিক্রিও বাড়ছে। আশা করি প্রকাশক- লেখক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং বিশিষ্টজন এই সংকটের গভীরে প্রবেশ করবেন। সংকট সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের প্রাণের অমর একুশে বইমেলাকে স্বমহিমায় পুণঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।