যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি তদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে জানা গেছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা চালায়, যেখানে অন্তত ১৭৫ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই শিশু। চলমান তদন্ত সম্পর্কে অবগত দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্টারসেপ্ট’ বুধবার (১১ মার্চ) এই খবর প্রকাশ করেছে।
তদন্তের এই ফলাফল সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ট্রাম্প বলেছিলেন, ওই স্কুলে হামলা চালিয়েছে ইরান।
কর্মকর্তাদের মতে, ‘শাজারাহ তাইয়্যবাহ’ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে যে প্রাণঘাতী হামলা হয়, তা ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি ‘টার্গেটিং ভুল’। তারা ওই ভবনটিকে ভুল করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌঘাঁটির অংশ বলে ধরে নিয়েছিল। অবশ্য সেই ঘাঁটি একসময় স্কুলের পাশেই ছিল।
চলমান তদন্তের বিষয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় একজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন।
কর্মকর্তারা বলেন, মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) হামলাটি চালায় অন্য একটি প্রতিরক্ষা সংস্থা থেকে পাওয়া অনেক পুরোনো স্থানিক মানচিত্রের ভিত্তিতে।
তদন্তে আরো জানা গেছে, আগে একসময় স্কুল ভবনটি আইআরজিসি নৌঘাঁটির সঙ্গে সড়ক দিয়ে যুক্ত ছিল। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে সেই ভবনটি আলাদা করে ফেলা হয়। এই তথ্য প্রকাশ করেছে নিউ লাইন্স মাগ্যাজিনের একটি অনুসন্ধান।
সবচেয়ে বেশি বেসামরিক নিহতের ঘটনা এই হামলাটি ঘটে এমন একসময়ে, যখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত একবছর ধরে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন কর্মসূচি বাতিল বা দুর্বল করার চেষ্টা করছিলেন।
ট্রাম্পের ‘দ্বিতীয় ইরান যুদ্ধের’ সময় এই হামলায় সবচেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়।
সরকারের এক কর্মকর্তা এটিকে বলেছেন, “ভয়াবহ অবহেলা।”
ট্রাম্পের দাবি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে, এই হামলার জন্য ইরান দায়ী।
৭ মার্চ সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, “আমি যা দেখেছি তার ভিত্তিতে আমার মনে হয়, এটা ইরান করেছে। তাদের কোনো নির্ভুলতা নেই। এটা ইরানই করেছে।”
আলজাজিরার খবর অনুযায়ী, বুধবার (১১ মার্চ) আবার ইরানে স্কুলে হামলা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন ট্রাম্প। তবে এবার তিনি ইরানের ঘাড়ে দোষ না চাপিয়ে বলেছেন, “ওই সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই।”
বিশেষজ্ঞের মত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সিভিলিয়ান প্রোটেকশন সেন্টার অব এক্সিলেন্স-এর সাবেক বিশ্লেষক ওয়েস ব্রিয়ান্ট এই হামলাকে বলেছেন, “টার্গেট নির্ধারণের মৌলিক নীতি ও মানদণ্ডের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা।”
তিনি মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার বিমান হামলার টার্গেট নির্ধারণে কাজ করেছিলেন।
তার মতে, শুধু একটি সংস্থা কোনো ছবি বা গোয়েন্দা তথ্য দিলে সেটার ওপর ভর করে সরাসরি হামলা করা উচিত নয়।
অন্য গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার।
লক্ষ্যবস্তুর আশেপাশে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করা বাধ্যতামূলক।
তদন্তে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি সেন্টকম প্রাথমিক তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
একজন কর্মকর্তা ইমেইলে বলেন, “ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন, তাই মন্তব্য করা অনুচিত।”
এ ছাড়া ন্যাশনাল জিওসপাশিয়া-ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স সংস্থা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
প্রমাণ বাড়ছিল স্কুলে মার্কিন হামলার প্রমাণ ধীরে ধীরে বাড়ছিল।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আইআরজিসি নৌঘাঁটিতে আঘাত করছে। একই সময়ে পাশের স্কুল ভবন থেকেও ধোঁয়া উঠছে।
তদন্তকারী সংস্থা বেলিংকাট জানায়, ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল টমাহক ক্রুস মিসাইল।
বর্তমান সংঘাতে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ব্যবহার করছে। ইসরায়েল বা ইরানের কাছে এই ক্ষেপণাস্ত্র নেই।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ২ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, “তথাকথিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যা-ই বলুক, আমেরিকা ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এবং সবচেয়ে নির্ভুল বিমান শক্তি ব্যবহার করছে। এখানে কোনো বোকামিপূর্ণ যুদ্ধের নিয়ম নেই।”
বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা সেন্টকম ইরান যুদ্ধে বেসামরিক নিহতের কোনো সরকারি সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
তবে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ইরানি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
আরেকটি তদন্তের ফল যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিমান হামলা পর্যবেক্ষণ সংস্থা এয়ারওয়ার্সের তদন্তে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনেই সাম্প্রতিক কোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, লক্ষ্যবস্তুগুলোর বেশিরভাগই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছিল, তাই বেসামরিক হতাহতের হার অনেক বেশি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।