ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোর। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি সরকারি গুদামঘর। প্রতিদিনের মতো এখান থেকে চাল, ডাল, তেলসহ নানা রেশন সামগ্রী তুলতেন পুলিশ সদস্যরা। কাগজে-কলমে হিসাবও মিলত ঠিকঠাক। কিন্তু সেই হিসাবের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য তালিকা। যাদের নাম তালিকায় আছে, কিন্তু মানুষ নেই। কার্ড আছে, কিন্তু সেই কার্ড কারও হাতে নয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই অদৃশ্য তালিকা, যার সংখ্যা কম নয়। ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোরে ২৫২টি ভুয়া রেশন কার্ড তৈরি করা হয়। সেই কার্ড দেখিয়ে বছরের পর বছর রেশন সামগ্রী উত্তোলন করা হয়েছে।এইভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৮৫ টাকা।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এই ঘটনায় ১১ জন পুলিশ সদস্য ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের সাবেক মেস ম্যানেজার এএসআই মো. আলাউদ্দিন, পুলিশ পরিদর্শক আরিফ মাহামুদ, মো. আল মামুন, মো. রেজাউল করিম ও কাজী রাজীউজ জামান। এছাড়া, কনস্টেবল আতিকুর রহমান, সাইফুল ইসলাম, মেহেদী হাসান, অফিস সহকারী তৌফিক এলাহী, রেশন স্টোরের ওজনদার জহির উদ্দিন ও বিক্রয় সহকারী সৈয়দ জসিম উদ্দিনকেও আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রেশন স্টোরের হিসাবপত্রে এমন অনেক কার্ড নম্বর পাওয়া গেছে, যেগুলোর বিপরীতে বাস্তবে কোনো পুলিশ সদস্যের অস্তিত্ব নেই। এই কার্ডগুলো ব্যবহার করে নিয়মিত রেশন তোলা হতো। পরে সেই রেশন বাজারে বিক্রি করা বা অন্যভাবে নগদে রূপান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঝালকাঠি পুলিশ লাইন্সের সাবেক মেস ম্যানেজারসহ কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তদন্তে দেখা গেছে, শুধু নিচু পদে নয়, পরিদর্শক পদমর্যাদার মাঝারি পর্যায়ের অন্তত চারজন কর্মকর্তার নামও এই তালিকায় এসেছে।
বছর বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে জালিয়াতির অঙ্ক মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, জালিয়াতির এই চক্র একদিনে তৈরি হয়নি। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও টাকার অঙ্ক বেড়েছে। জালিয়াতির শুরুটা হয়েছিল ২০১৩ সালের দিকে। তখন (২০১৩ সালে) ৬০টি ভুয়া কার্ড তৈরি করে প্রায় ১৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা মূল্যের রেশন উত্তোলন করা হয়। পরের বছর ৫৬টি কার্ডে প্রায় ২৯ লাখ টাকার রেশন তোলা হয়। একই ধারা পরবর্তী দুই বছর (২০১৫ ও ২০১৬ সালেও) অব্যাহত থাকে।
এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পাল্লা দিয়ে আত্মসাতের পরিমাণ আরো বাড়ে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২০ ও ২০২১ সালে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অত্মসাতের ঘটনা ঘটে। ২০২০ সালে ১৪৮টি ভুয়া কার্ডে প্রায় ৭৩ লাখ টাকার রেশন তোলা হয়েছে। পরের বছর ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৫২টি কার্ড ব্যবহার করে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার রেশন উত্তোলন করা হয়। সব মিলিয়ে আট বছরে আত্মসাতের অঙ্ক দাঁড়ায় গিয়ে প্রায় চার কোটি টাকায়।
তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে এই ঘটনা সামনে আসার পর বড় প্রশ্ন উঠেছে তদারকি নিয়ে। পুলিশ লাইন্সের রেশন স্টোরে নিয়ম অনুযায়ী কার্ড যাচাই, হিসাব মিলানো এবং নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ থাকার কথা। তাহলে এত বছর ধরে কীভাবে ভুয়া কার্ডে রেশন তোলা হলো?
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “হিসাবের খাতায় সবকিছু ঠিকঠাক দেখানোর চেষ্টা ছিল। কিন্তু, বাস্তবের সঙ্গে কাগজের হিসাব মিলিয়ে দেখলেই গরমিল ধরা পড়ে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঝালকাঠির সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, রেশন ব্যবস্থা মূলত সদস্যদের সহায়তার জন্য। যদি সেটাও জালিয়াতির শিকার হয়, তাহলে এটা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, আস্থার জায়গায়ও বড় ধাক্কা।
ঝালকাঠি জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “আসামিরা বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় কর্মরত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে পুলিশ বিভাগ।”