শিল্প ও সাহিত্য

রক্তচন্দন, হাতের ওপর হাত কিংবা অকূল পাথার

মস্তপানা কামরাঙা গাছটার ওপর রোদ্দুর কেমন জাঁক হয়ে বসে পড়েছে। এখন যেন ওর আর কোনো নড়নচড়ন নাই। এদিকে আমাদের ছোটখাটো শরীরের দাদাজান ধীর গতিতে পায়চারি করছে। আর খানিক বাদে বাদে আসমানের দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো বেলা এখন কত তা আন্দাজ করতে চাইছে। সূর্যের তেজ মেপে নিয়ে দাদাজান নির্ভুল সময় বলে দিতে পারে। দাদাজানের পায়চারীর ফাঁকফোকর গলিয়ে আমরা ইতিউতি দেখছি। যেমন টিয়াপাখিদের খেয়ে ফেলা কিছু টসটসা কামরাঙার কিয়দংশ পড়ে আছে দূর্বাঘাসের ওপর। একেবারে হলুদাভা নিয়ে জানান দিচ্ছে কীরকম পরিপক্ব ছিল সে। নিমপাতার বিশুদ্ধ বাতাস নাকের ভিতর ঢুকতেই আমাদের চোখ চলে যাচ্ছে গাছের তলায়। সেখানেও লেমনগ্রিনের আভা ছড়িয়ে এন্তার নিমফল ফেটেফুটে আছে। আমরা বুঝতে পারি এই ফলের দিকেও পাখিদের ঝোঁক কিছু কম নাই। দাদাজানের হাঁটার গতি দ্রুত হতেই আমরা মোটামুটি শান্তসুবোধ হয়ে থাকার ভাণ করি। আমাদের কোনো কিছুতে বিরক্ত হলে দাদাজান সোজা অন্দরবাড়িতে হাঁটা দেবে। আর উনার গোলাপি মুখ ঢেকে রাখা গুচ্ছের শাদা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলবে, পুলাপাইনের জ্বালায় আর টেকা গেলো না। এগো নিয়া খালি  মুছিবতই বাড়ে। ধ্যত্তেরি! 

আমরা জানি, দাদাজান কেন রেগে উঠছে? এই যে এখন ছায়া-ছড়ানো কামরাঙা গাছের মাথার ওপর সূর্য দিব্যি বসে আছে, অল্পস্বল্প লিলুয়া বাতাসে আমাদের গতর জুড়িয়ে যাচ্ছে, এরকম অলস সময় বড় দুর্লভ। এতক্ষণে সুরেশ নাপিতের আসার কথা। কিন্তু সে এখন অব্দি এসে পৌঁছায় নাই। ফলে দাদাজানের মেজাজ টং হয়ে আছে। সুরেশ নাপিত এলে আমরা দূর থেকেই ধরতে পারি। সে আসে একটা ঝ্যালঝ্যালা ধূতি পরে। ধূতির আবরণ ভেদ করে ওর কালোকোলো লিকলিকে পায়ের আদল বহুদূর থেকেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মলিন হয়ে যাওয়া ধূতির ওপর কোরারঙা খাদির কুর্তার ঝুল এতটাই খাটো যে, তাতে নাভি ঢাকা পড়তে পড়তে উদাম হয়ে যায় প্রায়ই। ও যখন আমাদের চুল কেটেছেটে যাওয়ার সময় আড়মোড়া ভাঙে, তখন উদোম নাভির গভীর গর্তের দিকে আমাদের দৃষ্টি আপনাআপনিই বসে যায়।

নির্মেদ পেটের ওপর স্থির হয়ে থাকা নাভি। পেটের ত্বক একেবারে টানটান ও সুরেশের হাত-মুখের বরনের চাইতে এক পরত ফর্শা। সুরেশকে দাদাজান বা আমাদের বাড়ির কেউই নাপিত বলে ডাকে না, বলে―সুরেশদাদা। দাদাজান মাঝেমধ্যেই রসিকতা করে বলে, আরেহ হুমুন্দির পুত, এত বেলা কইরা আইলা কিয়েরে? এত্তডি পুলাপাইনের চুলের ঢক ঠিক করতে করতে তুমার আইজ হাইঞ্জা লাইগ্যা যাইব। দাদাজানের কথা শুনে সুরেশদাদা বিড়ির দাগ ধরা ছোটছোট দাঁত বের করে হেসে বলে, বড় ঠাকুর, কিচ্ছু ভাইবেন না, সময় মতোই কাইজকাম অইয়া যাইব। 

সুরেশদাদার কাজ বলতে আমাদের জংলী চেহারাকে খানিকটা সভ্যভব্য করে তোলা। আমার চাচাতোফুপাতো ভাইদের মাথার চুল যতোটা সম্ভব কেটে ছোট করা যায়, সেটা করে বিন্দিবিন্দি আকৃতি দেয়া। কারো কানের পাশে জুলফি লম্বা করে রাখা যাবে না, দাদাজানের দেয়া এই আদেশ সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। একপাল ভাইদের মাঝে আমিই একমাত্র কন্যাশিশু। সুরেশদাদা আমার চুলে ববডছাট দেয়ার নাম করে দুই কানের অনেকখানি উপরে তুলে দেয় চুলের রাশি। চুল কাটার পরে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আমার বিদঘুটে চেহারা ভেসে ওঠে―ঠিক যেন গলাছিলা-মুরগির মতো। নিজের এরকম করুণ দশা দেখে আমি হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকি। কিন্তু আমার কান্না বোঝার মানুষ কই? কে বুঝবে ছেলেদের চুল কাটতে কাটতে সুরেশদাদার তৎপর হাত জোড়া হয়ত বেমালুম ভুলে যায়―বালিকাদের চুল এরকম করে ছোট করতে নাই। এইরকম গলাছিলা-মুরগির মতো করে তো নয়ই। 

আমারও কোনো জুলফি রাখা হয় না। কিন্তু পেছনের চুল উঠে যায় কানের লতির লেভেল ছাড়িয়ে এক আঙুল ওপরে।  সুরেশদাদা বরাবরই উত্তম নরসুন্দর। চুল কাটার সুখ্যাতির জন্যই আমাদের বাড়িতে ওর ডাক পড়ে ঘনঘন।  সুরেশের  কাঁধে ঝোলানো থাকে একটা কালো কাপড়ের ব্যাগ। এই ব্যাগেই থাকে ওর আয়রোজগারের যন্ত্রপাতি। যেমন ধারালো ক্ষুর, কয়েক সাইজের কাঁচি। একটা কালো রঙের পাথর আর অ্যালুমিনিয়ামের ছোট বাটি। যে বাটিতে অল্পস্বল্প জল রাখা যায়। ফিটকিরি। আর ভোরের আলোর মতো এক টুকরা ঘোলাটে নরম কাপড়। আমরা এই কাপড়ের নাম জানি―মার্কিন। সুরেশদাদা এসে একটা উঁচা টুলে নিজে বসে। আর  আমাদের বসায় অপেক্ষাকৃত নিচা কোনো পিঁড়িতে। তারপর বড় যত্ন করে ওই মার্কিন কাপড়ের টুকরা আমাদের শরীরে পেঁচিয়ে ঘাড়ের কাছে গিঁট দিয়ে দেয়। যাতে করে কাপড়ের টুকরাটা খুলে না যায়। মার্কিনে আমাদের ছোট দেহ আড়াল হতেই সুরেশদাদা শুরু করবে ওর কারবার। সুরেশদার কারবার আদতে চোখ আর হাতের। কাঁচি আর ক্ষুরের। কাঁচির ঘ্যাচঘ্যাচ শব্দে গুচ্ছ-গুচ্ছ-চুল লুটিয়ে পড়বে দূর্বা ঘাসের ওপরে। আমরা অবাক নয়নে তাকিয়ে দেখব, কীভাবে আমাদের চুল কালো রঙের আঙুরের মতো ঝোপা হয়ে যায়? অবশ্য এই আঙুরের ঝোপা শুধু আমার চুল কাটার পরই তৈরি হয়। ভাইদের চুল তো খুব বেশি দীঘল হওয়ার যো নাই। সামান্য আগপাছে বাড়লো কী বাড়লো না, অমনি সুরেশদাদা এসে হাজির। এসব যে কেবল দাদাজানের ইশারাতেই ঘটে তা বুঝতে আমাদের এখন আর অসুবিধা হয় না। মানে দাদাজান বাজারে গিয়ে সুরেশ নাপিতকে তলব দিয়ে আসে। 

‘হুমুন্দির পুত, আগামী জুম্বাবার নামাজের আগেই কিন্তু আহন লাগবো। পুলাপাইনের চেহারা বেঢক হইয়া গ্যাছে এক্করে।’ কাঁচির শব্দ থেমে গেলে শুরু হয় সুরেশদার হাতের আসল কারিশমা। কালো পাথরটা ঝোলা থেকে বের করে ওতে সামান্য জল ছিটিয়ে নেয় সে। একটা কাঠের হাতলওয়ালা ক্ষুর বের করে অই পাথরের গায়ে ঘচরমচর শব্দ তুলে ধার দিতে থাকে। আমরা চক্ষুর কোণ দিয়ে সুরেশের হাতের চলাচল লক্ষ্য করি। আর আমাদের ছোট্টবুক ঢিপ্ঢিপ্ করে ভয়ে। এরপর সুরেশদা কী করবে আমরা জানি। আমাদের এক কান এক হাত দিয়ে ভাঁজ করে রেখে নিপুণ হাতে ক্ষুর চালাবে কানের পাশ দিয়ে। তারপর ওই ক্ষুর নামবে গিয়ে ঠিক ঘাড়ে! ঘাড়ের ওপর ক্ষুরের ধারালো উপস্থিতি টের পাওয়ার পর কীভাবে ভয় না পেয়ে থাকা যায়? কিন্তু সুরেশ নাপিত নির্বিকার। ক্ষুর থেকে আমাদের চুলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলি বাম হাতের চেটোয় মুছবে আর নিপুণভাবে ক্ষুর চালাবে। সুরেশদার ক্ষুর আমাদের একফোঁটা রক্ত না ঝরিয়ে মসৃণ গতিতে নেমে যাবে ঘাড়ে। আর আমরা ভয় কিংবা আতঙ্কে মাথা হেট করেই রাখব। সুরেশদাদা আমাদের মনোভাব বুঝতে পেরে বলবে, ‘মাতা কিন্তু নাড়াইও না। কাইট্টা যাইব।’

হায় হায় এই লোক কী পাষাণ? পাষাণ না হলে কীভাবে এত শান্তভাবে বলা যায় এই কথা? আমাদের বুক ঢিপঢিপানির শব্দও কি কানে যায় না তার? পাষাণ! পাষাণ! ক্ষুরের তলায় আমাদের পেতে রাখা মাথা দেখেও কি এই লোকের সামান্য দয়ামায়া হয় না? আমরা নড়বো কেন? জানের ডর কার নাই? কার থাকে না জানের ডর? সুরেশেদার হাতের ধারালো ক্ষুরে যদি কাটা যায় আমাদের মাথা, তাহলে কি বেঘোরে প্রাণ হারাবো না আমরা? ভয়ে আধমরা হয়ে থাকা আমাদের কাঁচুমাচু চেহারা একদম গ্রাহ্য করে না সুরেশদাদা। এমনকী আমাদের দাদাজানও। দাদাজানও কী কম পাষাণ? হায়রে হায়! এই বুইড়াই আদতে বিরাট-পাষাণ!  নইলে কীভাবে থুতনির তলায় শাদা শাদা মেঘের মতো ফুরফুরে দাঁড়িতে ধীরেসুস্থে হাত বুলিয়ে বলে, ‘সুরেশ, ভালো কইরা চাইছ্যা দিও কিন্তুক। ঘাড়ের উপ্রে চুল থাকলে ওগো গরম লাগবো।’ হেট করে রাখা মাথা নিয়ে আমরা এমনিতেই ভয়ংকর বিপদাপন্ন। এক্ষণে দাদাজান কীনা বলে গরমের কথা? এইটা কী গ্রীষ্মকাল নাকি শীতকাল? শীতকাল নাকি গ্রীষ্মকাল? আমাদের ধন্দ কাটে না। চারপাশ দেখেশুনে গরম নাকি শীতের সিদ্ধান্তে পৌঁছাব সেটাও হয়ে ওঠে না। ক্ষুরের তলায় পেতে রাখা মাথা নিয়ে কে কবে শীত-গ্রীষ্মের ফারাক বুঝতে পেরেছে? ফলে দাদাজানের কথা মতো আমাদের গরম লাগতে শুরু করে। কিন্তু ঘাড়ে হাত দিয়ে চুল আছে কী নাই তা অনুভব করার সাহসও সঞ্চয় করতে পারি না কেউ। 

২.      চুল কাটা সম্পন্ন করে সুরেশ নাপিত নির্ভয়ে চলে গেলেও নির্ভার জীবনের স্বাদ আমাদের ভাগ্যে জোটে না। জুম্মাবারের পরদিন কিনা নাজিল হয় আরেক মুছিবত! রেডক্রসের নার্স আসে রাজহাঁসের মতো তইতই পায়ে। সেরকমই ত্রস্ত হয়ে। তার পরনে শাদা শাড়ি আর মাথায় পায়রার মাথায় ফুলে থাকা খোঁপার মতো টুপি। কেমন যেন পড়োপড়ো অবস্থার ভিতরও সেঁটে আছে। কিন্তু পড়ে যায় না। নার্সের হাতে একটা শাদা রঙের বাক্স। বাক্সের ওপরে টকটকে লাল রঙের ক্রস চিহ্ন আঁকা। নার্স কেন এসেছে সে গোমর আমরা ভাঙতে পারি না। কিন্তু গোমর ভাঙার ইচ্ছা নিয়ে আশেপাশেই ঘুরঘুর করতে থাকি। রেডক্রস থেকে নার্স আমাদের বাড়িতে আসে কালেভদ্রে। নার্স এলেই বাড়িতে আমরা ছোট্ট শিশুর ত্রাহি কান্নার আওয়াজ শুনি। বড় দাদিজানের পালক মেয়ে পালুর ঢাউস পেটের দিকে আমরা অবাক হয়ে তাকাতে তাকাতে ডাংগুল্লির ডাং হাতে নিয়ে বাড়ি মারতে ভুলে যাই। মেয়েমানুষের পেট কী করে এত বড় হয়? এত বড় পেট নিয়ে পালুর মন্থর চলাচলের ভাবনায় আমরা কুতকুতের ঘর ডিঙাতে ভুল করি।

‘আইচ্ছা পালুর পেট এরকম ফুইল্যা উঠছে ক্যান?’ ‘পালুর কি কোনো ব্যারাম হইলো নাহি?’ ‘পালু ক্যান হারাদিন তেঁতুলের সাথে লবণ মিশায়া খায়?’ বড় দাদিজানের বেডটির কাপ হাতে নিয়ে পালু পলকে আমাদের চোখের আড়াল হয়ে যায়। পালুর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আমাদের মন কেমন করে ওঠে। ‘কিমুন হাসিখুশি মাইয়াডার এমুন ব্যারাম হইলো ক্যামনে?’ বড়সড় পেট নিয়ে পালুকে খুব বেশিদিন হাঁসফাঁস করতে হয় না। রেডক্রসের নার্স আসে শাদা রঙের এই বাক্সটা নিয়ে। বড় দাদিজান গরমজল নিয়ে ঘরে ঢোকার খানিক বাদেই আমরা শিশুর ত্রাহি চিৎকার শুনি। হপ্তাখানেক বাদে পালু ঘর থেকে বেরুলে আমাদের বিস্ময়ের সীমা পরিসীমা থাকে না। ‘ইয়াল্লা, পালুর বড় প্যাটটা কই মিলায়া গেলো?’ ‘আইচ্ছা মাইয়া মাইনষের প্যাট এত বড় ক্যামনে হইতে পারে? পালুর ব্যারাম কি সাইরা গেলো নাহি?’  পালু হাঁটে কেমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। যখন বসে থাকে শাড়ির আঁচল দিয়ে কী যেন ঢেকে রাখে। আমাদের কৌতূহল বেড়ে যায়। আমরা একদিন দেখে ফেলি পালু আঁচলের তলায় একটা ছোট্ট বাচ্চা ঢেকে রাখে। হয়তো ওকে ঢেকেঢুকে বুকের দুধ খাওয়ায়। কিন্তু রেডক্রসের নার্স আজ ফের এসেছে কী জন্য?

দাদাজান আমাদের নাম ধরে ধরে ডাকে। আমার ভাইরা ঘরে ঢুকে আর খানিক বাদে শার্টের বাম হাতের আস্তিন গুটাতে গুটাতে বের হয়ে আসে। আমার নাম ধরে ডাকলে ঘরে গিয়ে আমি অবাক হই। নার্সের শাদা বাক্সটার ঢাকনা খোলা। আর নার্স হাতে সুঁই নাকি কী একটা নিয়ে বসে আছে। একহাতে শাদা তুলার বল। দেখে আমার শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ইয়াল্লা, নার্স কি আমারে ইনজেকশন দিবে নাকি?  দাদাজান বলে, ‘বইন, আহো আমার কুলে আইস্যা বহো।’ দাদাজান এমনিতেও আমাদের আদর করে। কিন্তু আজ একেবারে কোলে নিতে চাইছে? ব্যাপারখানা কী?  আমি দাদাজানের পাশ ঘেষে দাঁড়াই। নার্স আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে, ‘কী খুকি ডর লাগতেছে?’ আরেহ কীসের ডর? কী কয় এই বেটি?   আমি দাদাজানের কোলের ভিতর ঢুকে যাই। নার্সকে আমার ভূতপেত্নীর মতো মনে হয়। বাক্সের ভিতর নিশ্চয়ই ঘাড় মটাকানোর জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে?

নার্স এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। আমার বাম বাহুতে তুলার বল ঘষে দেয়। দারুণ মিষ্টি মউতাতে চারপাশ ভরে ওঠে। নার্সের হাতে কী আছে আমি দেখার আগেই দাদাজানের ডান হাতের চওড়া কব্জি আমার দুইচোখ ঢেকে ফেলে। আর তখুনি কিনা একটা ডেউয়াপিঁপড়া আমার হাতে মরণ কামড় বসিয়ে দেয়।  দাদাজানের হাতের আড়াল সরে গেলে দেখি আমার বাহুতে বিন্দু বিন্দু রক্ত গোলাকার বৃত্ত তৈরি করেছে। নার্স বলে, ‘চুলকাইলেও চুলকাইবা না কিন্তু।’ আমার চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করে।  ‘এই নার্স দেখি আদতেও পেত্নি। বলা নাই কওয়া নাই আমারে টিকা দিয়া দিলো!’ আমি তখনো টের পাই নাই আমার চোখের পানি আরও কতোটা ঝরে পড়বে? টের পাই যখন দেখি কয়দিন বাদেই বাহুর গোলাকার বৃত্ত পেকে ওঠে। ক্রমে সিকি থেকে আধুলি সমান জায়গা নিয়ে ঘা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের অন্দরমহলের মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া পড়ে। আম্মা ব্যাকুল হয়ে বলে, ‘আল্লাহ ওর টিকাডা এমুন পাকলো কিয়েরে?’

চারদিকেই আম্মার তীক্ষ্ম নজর। আম্মার কাছে ওষুধপত্রসহ এমনিতেই টুকিটাকি নানান কিছুই থাকে। আম্মা খুবই লক্ষ্মী কিসিমের। কত কিছুরই না সে যত্নআত্তি করে। আম্মার কাছে আছে একটা বিউটিবক্স। এত সুন্দর জিনিসটা! এই বক্স আকাশি আর নীলের মখমল কাপড়ে মোড়ানো। যার ভিতরে সাজানো থাকে আম্মার সাজগোজের সরঞ্জাম। যেমন তিব্বত পারফিউম। ছোট্ট একটা নীল শিশিতে এই পারফিউম থাকে। আম্মা এই পারফিউম তুলাতে ভিজিয়ে নিয়ে কানের লতির পেছনে ও গায়ে মাখে। আছে ফেসপাউডার আর রুজের গোল গোল সুন্দর কৌটা। নেইলপলিশের বোতল। লিপস্টিক দুই-তিনটা। আরও আছে শ্বেত ও রক্তচন্দন। মরিয়মবিবির ফুল। এমন আজব এই ফুল! আম্মার এইসব আগলে রাখা জিনিসপত্রে কারো হাত দেয়ার এখতিয়ার নাই। এমনকি আমাকেও ধরতে দেয় নাই কোনো দিন। আরেকদিন এই নার্স যখন এসেছিল আম্মা তখন এই মরিয়মবিবির ফুল বড় একটা গামলায় ভিজিয়ে দিয়েছিল। ফুল ভেজানো পানি নিয়ে আম্মা ছুটেছিল বড় দাদিজানের ঘরে। বড় দাদিজানের নাতনি ঈদেল আপাকে আমরা দেখেছিলাম ঢাউস একটা পেট নিয়ে কচ্ছপ গতিতে চলাফেরা করতে। মরিয়মবিবির ফুল ভেজানো পানি খাওয়ার পর ঈদেল আপার পেটও সমতল হয়ে গিয়েছিল। দিনকয়েক বাদে পালুর বাচ্চার মতো একটা ছোটমোট শিশু ঈদেল আপার কোলে দেখেছিলাম আমরা।

আম্মা আর চাচিমাদের বলাবলি করতে শুনেছিলাম, ‘মইরমবিবির ফুল ভিজানো পানি না খাইলে এত সহজে ঈদেলের খালাস হইতো না।’ এসব শুনে আমি কান আরও খাঁড়া করে বুঝার চেষ্টা করেছি―‘খালাস’ কারে কয়? ঈদেল আফার কী বা কীয়ের খালাস হইছে? এর চাইতে বেশি উদগ্রীব হলে মাইর একটাও আর মাটিতে পড়বে না। মাইরের ভয়েই আমাকে এইসব কথাবার্তা পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। এক্ষণে আম্মা আমার টিকা-ঘায়ের পেছনে উঠেপড়ে লাগে। আম্মা বহুত কিছু টোটকাফোটকাও জানে। আম্মাকে আমার রেডক্রসের ওই নার্সের চাইতেও দক্ষ মনে হয়। রক্তচন্দনের টুকরা বের করে আম্মা পানি দিয়ে পাটায় ঘষে নেয়। ঘন ক্বাথ বের হলে আঙুলের কোমল ডগা দিয়ে আমার বাহুর বৃত্তের চারপাশে প্রলেপ দিয়ে দেয়। এতে দ্রুত ঘা শুকায় না ঠিকই, কিন্তু জ্বালাপোড়ার উপশম হয়। আম্মা প্রতিদিন নিয়ম করে চন্দনের ক্বাথ বের করে। আর সকাল-সন্ধ্যা আমার ঘায়ের চারপাশে প্রলেপ লাগাতেই থাকে। 

ঢাকা থেকে আব্বা একদিন বাড়িতে আসে। আব্বাকে কে যেন খবর দিয়েছে আমার টিকা-ঘা শুকায়না কেন জানি। আব্বা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তাই চলে এসেছে। আসার সময় আমার আর ছোটফুপুর জন্য কিনে এনেছে দুইজোড়া টেডি জুতা।  আব্বাকে দেখে আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। আব্বা আমাকে কোলে নিয়ে বলে, ‘কানতেছ ক্যান? আমি তো আইস্যা পড়ছি। তুমারে এখন অষুধ কিনা দিব। আর তোমাদের ঢাকা নিয়া যাব।’ বলেই আমার বাম হাত তুলে নিয়ে পরখ করে ঘায়ের অবস্থা। আব্বার মুখ বেদনায় ম্লান দেখায়। আমাকে বুকের সাথে জাপটে ধরে বলে, ‘আইচ্ছা আর কাইন্দো না। অহন সাইরা যাইব। আর জুতা পিন্দা থাকবা। পাওয়ের সামনে চাইপ্যা থাকা জুতা পিন্দলে পাও সৌষ্ঠবের হয়। তুমার পাও-ও সৌষ্ঠবের হইব।’

আব্বা সত্য-সত্যই আমাদের ঢাকা নিয়া আসে। সাথে দাদিজানও আসে। ছোটফুপু। ছোটকাকা। ঢাকায় এসেও আম্মা নিয়ম করে রক্তচন্দন পাটায় ঘষে ঘষে ক্বাথ বের করে। যত্ন করে আমার ঘায়ের চারপাশে প্রলেপ দেয়ার কাজে কোনো হেরফের ঘটে না। আমার টিকা-ঘা এতে করে সামান্য টান ধরতে শুরু করে। 

৩. ঢাকায় এসে আমি আর ছোটফুপু চোস্ত পায়জামার সঙ্গে টেডি জুতা পরে বেড়াতে যাই আম্মার আত্মীয়দের বাসায়। কিন্তু টিকা-ঘা আমাকে অল্পস্বল্প ভোগাতেই থাকে। আব্বা আমার জন্য একদিন বেগুনিরঙা নেটের ভারি সুন্দর একটা জামা কিনে আনে। এনে বলে, ‘যাও এইটা গায়ে দিয়া আম্মার সাথে ফটো তুইল্যা আসো।’ ফটো কী জিনিস? একদিন বিকালবেলা দাদিজান, ছোটফুপু, ছোটচাচাকে নিয়ে আম্মা একটা ঘরের ভিতর ঢোকে। কী কী জানি বলে আমি তেমন বুঝতে পারি না। একটা লোক আম্মা, দাদিজান আর ছোটফুপুকে গদি-আঁটা টুলের ওপর বসায়। বসিয়ে নানা কায়দায় লাইট জ্বালায়। ফুটে থাকা সূর্যমুখী ফুলের মতো সেসব লাইটের আলোতে আমাদের চোখমুখ কুঁচকে ওঠে। ছোটকাকাকে একপাশে দাঁড় করিয়ে দিয়ে লোকটা আমার দিকে তাকায়। সে হয়তো আমাকে কই বসাবে নাকি দাঁড় করিয়ে রাখবে এরকম হেলদোলের ভিতর থাকে। আমি দাদিজানের খুব ন্যাওটা বিধায় গা ঘেষে থাকি। লোকটা কিছু না বলে লাইট জ্বালায় আর সবাইকে নির্দেশ দিতে থাকে কে কোন দিকে তাকাবে। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘খুকী দাদির কোলে জুত কইরা বসো।’

আরেহ জুত কইরা কীভাবে বসব? দাদিজানকেই সে বসিয়ে রেখেছে কোনোরকম হাতল ছাড়া একটা টুলের ওপর। আমি জুত কইরা বসতে গেলে দাদিজান উলটা দিকে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু দাদিজান পড়েটড়ে যায় না। বরং তার দুই হাত আমাকে শক্ত করে আলিঙ্গনাবদ্ধ রাখে। এখন আমি বাম বাহুতে টান-ধরা টিকা-ঘা; এই বেদনা-ভরা হাত  কই রাখি? দাদিজানের পাশে বসা আম্মার ডানহাতের ওপর আমার বামহাত ঠেস দিয়ে রাখি। মানে আমার না-বসা না-দাঁড়ানো একটা ভঙ্গি থাকে। আর মনে মনে ভারি ব্যথিত হয়ে ভাবি―‘আমার এই জখমীহাত নিয়া আম্মাও কেন কিছু ভাবতেছে না ক্যান? ভাবলে তো বলতে পারতো তুমার হাতটা আমার কুলের ওপর রাখো।’

লোকটা কালো মতো একটা বাক্স এনে ওতে চোখ লাগিয়ে কী যেন দেখেটেখে বলে, ‘রেডি ওয়ান-টু-থ্রি।’ খুঁট করে শব্দ হয়। লোকটা বলে, ‘আবার তাকান এই আমার দিকে। সবাই তাকান। হ্যাঁ ঠিক আছে।’ ফের শব্দ হয়―খুট! আব্বা একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ফটোটা নিয়ে আসে। ছোটফুপু আর আম্মার সাথে আমিও ঝুঁঁকে ঝুঁঁকে ফটোটা দেখি। অবিকল আমার মতো দেখতে কে যেন দাদিজানের কোলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে গাঢ় করে কাজল দেয়া। টিকা-ঘায়ের অংশটা কালো রং ধরে আছে। আমার জখমীহাত আম্মার ডান হাতের ওপর এলিয়ে রাখা। আমি একইসঙ্গে দুইজনকেই অধিকার করে আছি!  ফটো তুলে আসার কয়েক মাস বাদে আম্মার পেটটাও ফুলে ঢোল হয়ে ওঠে। আমি কেমন ধন্দে পড়ি। ‘আইচ্ছা, আম্মার প্যাটটা ফুইল্যা উঠলো ক্যান হটাশ?’ আমার চিন্তা বেড়ে যায়। এই ঢাকাশহর কি রেডক্রসের নার্সটা চেনে? না-চিনলে আম্মার ব্যবস্থা কী হইব? আমার চিরচেনা আম্মা কেমন বদলে যেতে শুরু করে। আম্মার এই বদল আমাকে দুঃখিত করে তোলে। রক্তচন্দনের টুকরা নিয়ে আম্মা আর আগের মতো পাটায় ঘষে ঘষে ক্বাথ বের করে না। আদতে আম্মা নিচে বসে কোনো কাজই আর করতে পারে না।   টকটকে গৌর গায়ের রঙ ও দীর্ঘদেহের কারণে আম্মাকে বড় দাদিজানের পালক মেয়ে পালুর মতো দেখায় না । কিন্তু আম্মা যখন হাঁটে পেছন থেকে পালুর মতোই ভাঙাচোরা মনে হয়। যেন আম্মার দেহে আর কোনো বল নাই। আম্মা যেন হঠাৎ করে একটা প্রাচীন কচ্ছপে রূপান্তরিত হয়েছে। আম্মার বয়স এখন যেন তিনশ বছরের চাইতেও বেশি। 

আমাদের ফটোটা কাচের ফ্রেমে বাঁধাই করে আম্মা ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে। আম্মা যখন কাজে ব্যস্ত থাকে আমি ফটোটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। আহা! কত দ্রুতই না সময় চলে যায়? মাত্র কয়েক মাস আগেও আমি দাদিজানের কোলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আম্মার ডান হাতের ওপর আমার জখমী হাতটা রেখেছিলাম। আর আজ আম্মা কিনা আমার খবরই রাখে না! আমার টিকা-ঘা ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। দাদিজান আমাকে গোসল করিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘হালার ঘাওডা এমুন জ্বালান জ্বালাইতেছে ক্যান? কত্তদিন হইয়া গেলো সারনের নামনিশানা নাই।’ আম্মা একদিন হঠাৎ করে কোথায় জানি চলে যায়। দাদিজানকে দেখি মুখ শুকনা করে তছবি জপে। আব্বাকেও দেখি না দুইদিন। তিনদিনের মাথায় আব্বা মিষ্টি হাতে নিয়ে বাসায় আসে। আমাকে ডেকে বলে, ‘এদিকে আসো। মন খারাপ কইরা ঘুরাঘুরি করতেছ ক্যান? দাদিজানরে বলো তুমারে মিষ্টি খাইতে দিতে। তুমার একটা ভাই হইছে।’ এইগুলা আব্বা কী বলে? ‘ভাই’ কেমনে হইলো?  সুরেশ নাপিতের কেটে দেয়া আমার মাথার ববডছাট চুল নেড়ে দিয়ে আব্বা বলে, ‘বিকালে রেডি হইয়া থাইকো। তুমার আম্মা আর ভাইরে দেখতে হাসপাতালে নিয়া যাব।’

আব্বা ঠিকই দাদিজান আর আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আরেহ হাসপাতাল এত সুন্দর! কী সুন্দর সাজানো-গোছানো গাছলতা। ফুলের বাগান। আর কী মিষ্টি সুবাস এই হাসপাতালের! ঝকঝকে-তকতকে মেঝে।  শাদা একটা বিছানায় আম্মা শুয়ে আছে। আমাকে দেখে হাসে। আল্লাহ! আম্মার হাসি এত করুণ! আম্মার একহাতে কী যেন নল লাগানো। হলুদাভ তরল নেমে আসছে ওই নল বেয়ে। বাম হাতটা আম্মা নাড়াতে পারে না। আব্বা বলে, ‘অপারেশন হইছে তুমার আম্মার। তুমারে কিন্তু আর কোলে নিতে পারব না।’ শুনে আম্মা হাসে। আম্মাকে কেমন বুড়া বুড়া দেখায়। আম্মা এই কয়দিনে দাদিজানের মতো হয়ে গেল কীভাবে?  আম্মা ডান হাত তুলে আমাকে ডাকে, ‘এদিকে আসো। তুমার একটা ভাই হইছে, দেখছ?’  আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বলি।  আম্মার কথা শুনে আমি যেন মাঝ পুকুরে হাবুডুবু খেতে থাকি। ‘আমার ভাই হইলো কেমনে? মরিয়মবিবির ফুল ভিজানো পানি আম্মা কি খাইছিল? আম্মারে কে ওই পানি খাওয়াইলো? রেডক্রসের নার্সটা কি আইছিল এইখানে?’ দিন কতক বাদে আম্মা বাসায় চলে আসে। আম্মার আঁচলের তলায় কী যেন লুকানো। বড় দাদিজানের পালক মেয়ে পালুর মতো লাগে আম্মাকে। ঈদেল আপার মতো লাগে। আম্মা সোজা হয়ে হাঁটতে পারে না। আব্বা কিংবা ছটফুপু আম্মাকে হাঁটতে সাহায্য করে। ওদের ধরে ধরে আম্মা হাঁটে। খাটের ওপর বসে আম্মা আঁচলের তলায় কী যেন লুকিয়ে রাখে। আমি চোখের কোণা দিয়ে দেখি একটা গ্যাদা-বাচ্চাকে আম্মা বুকের দুধ খাওয়ায়। আজব! এইটা কীভাবে আসলো? আব্বা আমাকে বলছিল, ‘অপারেশন হইছে তুমার আম্মার। তুমারে কিন্তু আর কোলে নিতে পারব না।’ আমি তাই আম্মার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকি। বেশি খারাপ লাগলে দাদিজানের কোলে গিয়ে বসে থাকি।

আমার টিকা-ঘা ক্রমে শুকিয়ে উঠছে। দাদিজান দেখে মাঝে মাঝেই আঁতকে উঠে বলে, ‘আল্লাহ! মাইয়া মাইনষের ডেনায় এমুন দাগ হইলে কী ভালো দেহায়? এমুন কইরা টিকা দেওনের দরকার কী আছিল?’ দেয়ালে ঝুলে থাকা আমাদের ফটোটা আমি প্রতিদিনই বারকয়েক দেখি। আমার জখমী হাত আম্মার ওপর ফেলে রাখা। এখন আম্মা কিনা নিজেই জখম হয়ে ফিরেছে।  আমি এতকিছু বুঝে উঠতে পারি না। কিন্তু আমার কেন যেন কান্না পায়। আম্মা সারাক্ষণ আমার ভাইয়ের যতœআত্তি করে। গোসল করানো, তেল মালিশ করা, খাওয়ানো। ওর দুধের বোতল সাবান-গরম পানি দিয়ে ধোয়াধোয়ি করা। আমাকে দেখার অবসর আম্মার আর নাই! রক্তচন্দন পাটায় ঘষে ক্বাথ বের করে আম্মা যদি আমার বুকের ভিতর লাগিয়ে দিতো, তাহলে হয়তো খানিকটা আরাম বোধ করতাম আমি...!