সারা বাংলা

শপিংমলে দাম বেশি, ঈদে নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা ফুটপাত

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। ঈদকে সামনে রেখে গাইবান্ধা শহরে জমে উঠেছে কেনাকাটা। শহরের বড় শপিংমলগুলোতে সামর্থ্যবান ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ঈদ মার্কেট এখন অনেকটাই শহরের ফুটপাতজুড়ে।

মূল্যস্ফীতির চাপে যখন নামিদামি দোকান থেকে কেনাকাটা অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন ফুটপাতের এই অস্থায়ী বাজারগুলোই হয়ে উঠেছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদ আনন্দের প্রধান ভরসা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটাতে ফুটপাতের দোকানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নদীভাঙন ও মঙ্গাপীড়িত জেলা হিসেবে পরিচিত গাইবান্ধা। এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে অর্থনৈতিকভাবে জেলার অনেক মানুষ এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ঈদের আগে চাকরিজীবীরা বেতন ও বোনাস পেলেও নিম্ন আয়ের মানুষের কেনাকাটা সীমিত পরিসরেই থাকে।

শহরের পুরাতন জেলখানা মোড়ে ঈদের কেনাকাটা করতে পৌরসভার তিনগাছতলা এলাকা থেকে এসেছেন পেশায় দিনমজুর মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, “বড় দোকান থেকে কাপড় কেনার সামর্থ আমাদের নেই। এখানে কম দামে ভালো কাপড় পাওয়া যায়। তাই এখান থেকেই কম দামে নতুন জামা কিনতে পারছি।”

শহরের গাউনপট্রি মার্কেট কমদামের পোশাকের জন্য পরিচিত। সেখানে ফুটপাতে জামাকাপড় দেখছিলেন হাফেজা বেগম। তিনি বলেন, “মাত্র দুই হাজার টাকার মধ্যে পরিবারের সবার কাপড় কিনতে হবে। হামরা তো বড়লোক নই যে বড় দোকান থেকে কিনবো। যে টাকা এনেছি, এই কমদামি মার্কেট থেকেই কাপড় কিনতে হবে।”

শহরের চৌধুরী শপিংমলের আহান ফ্যাশনের কর্ণধার রনি বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে বিক্রি মোটামুটি ভালো হচ্ছে। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর কাপড়ের দাম বেশি। অনেক ক্রেতা দাম বেশি শুনেই ফুটপাতের দোকানে চলে যান।”

তিনি আরো বলেন, “শিশুদের পোশাকের চাহিদা বেশি। শিশুদের পোশাক ১০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। নারীদের সালোয়ার-কামিজ এবং পুরুষদের শার্ট-প্যান্ট ও পাঞ্জাবি এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এ বছর বাজারে দেশি পোশাকই বেশি, বিদেশি পোশাক নেই।”

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেকের পক্ষেই বড় মার্কেটে কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ফুটপাতের স্বল্পমূল্যের কাপড় ও বিভিন্ন পণ্যের দোকানগুলোই হয়ে উঠেছে তাদের ভরসার জায়গা।

শহরের ডিবি রোড, নিউ মার্কেট, দাশ বেকারী মোড় ও স্টেশন রোডের দুই পাশজুড়ে এখন সারি সারি অস্থায়ী দোকান বসেছে। শিশুদের ফ্রক, পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, সালোয়ার-কামিজ, জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট থেকে শুরু করে টুপি, আতর ও জায়নামাজ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে এখানে। কম দামে পছন্দের জিনিস পেয়ে খুশি ক্রেতারা, বিক্রেতারাও সন্তুষ্ট বেচাকেনা নিয়ে।

শুক্রবার (১৩ মার্চ) দুপুরে শহরের বিভিন্ন ফুটপাতে গিয়ে দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। অনেক জায়গায় পা ফেলার জায়গা নেই। বিশেষ করে ইফতারের পর গাউনপট্রি ও স্টেশন রোড এলাকায় মানুষের ঢল নামে। ছুটির দিনে ভিড় আরো বেড়ে যায়। টুপি, আতর ও জায়নামাজের দোকানগুলোতেও মুসল্লিদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। শহরের স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ এলাকায় কাপড় বিক্রি করা আহাদ মিয়া বলেন, “তার ক্রেতাদের বড় অংশই দিনমজুর, রিকশাচালকসহ বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে মধ্যবিত্তরাও আসছেন। অনেকের আয় সীমিত হওয়ায় বড় মার্কেটের দাম তাদের নাগালের বাইরে। তাই তারা ফুটপাতেই ভরসা খুঁজে পান।”

রিকশাচালক মাহাবুব বলেন, “আমাদের ঈদ মার্কেট মানেই ফুটপাত। এর বাইরে কেনাকাটা করার সামর্থ নেই। এখান থেকে কম দামে যা পাই, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি।”

মূল্যস্ফীতির চাপে যখন বড় দোকানে কেনাকাটা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন ফুটপাতের এই অস্থায়ী বাজারগুলোই নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদ আনন্দের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর এই চেষ্টাই যেন ফুটপাতজুড়ে তৈরি করছে ভিন্ন এক ঈদের আমেজ।