ধাক্কাটা পাকিস্তান শুরুতেই দিয়েছিল—বোলিংয়ে যেমন, তেমনি ব্যাটিংয়েও। তাতেই শুরু থেকেই ব্যাকফুটে চলে যায় বাংলাদেশ। তার ওপর বৃষ্টি যেন বাড়িয়ে দেয় স্বাগতিকদের দুর্ভোগ।
মিরপুরের শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম ওয়ানডের হার ভুলে শুক্রবার দ্বিতীয় ম্যাচে একেবারে ভিন্ন রূপে দেখা দেয় পাকিস্তানকে। ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই দাপুটে পারফরম্যান্সে বাংলাদেশকে কার্যত এলোমেলো করে দিয়ে দারুণভাবে সিরিজে ফিরে আসে তারা। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে বাংলাদেশকে ১২৮ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১–১ সমতা ফেরায় পাকিস্তান।
টস হেরে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা দারুণ করে পাকিস্তান। মাত্র ১২.২ ওভারেই দলীয় একশ রানে পৌঁছে যায় তারা। এরপর মাঝপথে কিছুটা বিপর্যয়ে পড়লেও এক সময়ে মনে হচ্ছিল তিনশ ছাড়িয়ে যাবে তাদের রান। কিন্তু বাংলাদেশের বোলারদের দারুণ প্রত্যাবর্তনে শেষ পর্যন্ত ২৭৪ রানের সংগ্রহ গড়ে অতিথিরা।
জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ—মাত্র ১৫ রান তুলতেই হারায় ৩ উইকেট। সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেনি স্বাগতিকরা। এর সঙ্গে যোগ হয় বৃষ্টির দুর্ভোগ।
বিদ্যুৎ চমকানো ও মুষলধারে বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ থাকে প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে খেলা আবার শুরু হলে বাংলাদেশের সামনে কঠিন সমীকরণ দাঁড়ায়। বৃষ্টি আইনে ৩২ ওভারে ২৪৩ রানের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে সেই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ ১১৪ রানের বেশি করতে পারেনি।
প্রথম ওয়ানডেতেও পাকিস্তান ১১৪ রানে অলআউট হয়েছিল। এবার বাংলাদেশকেও ওই রানে গুড়িয়ে দিল পাকিস্তান।
ব্যাটিং বাংলাদেশের চিন্তার কারণ ছিল। ব্যাটসম্যানরা ফর্মে না থাকায় বড় রান তাড়া করা ছিল চ্যালেঞ্জিং। আগের ম্যাচে লক্ষ্য নাগালে থাকায় ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা দিতে হয়নি। কিন্তু আজ বড় পরীক্ষার মঞ্চে ফেল তারা। তানজিদের শুরুতে ফিরে যাওয়া। সাইফের অসহায় আত্মসমর্পণ ও নাজমুলের উইকেট বিলিয়ে আসা সবটাই হয়েছে ৪.৩ ওভারের মধ্যে। বৃষ্টির আগে-পরে লিটন ও তাওহীদ ৪৮ বলে ৫৮ রান যোগ করলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না।
৭৩ রানে লিটন সাদাকাতের বলে এলবিডব্লিউ হলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার মিছিল শুরু হয়। পরের ব্যাটসম্যানরা কে কার আগে আউট হবে তা নিয়ে ছিল প্রতিযোগীতা। পরের ৪১ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। বাঁহাতি স্পিনার সাদাকাতের শিকার হন আফিফ (১৪) ও রিশাদ (৫) । মিরাজ ১ রানের বেশি করতে পারেননি। তাওহীদ ২৮ রানে হারিস রউফের বলে এলবিডব্লিউ হন।
হারিস ও সাদাকাত ৩টি করে উইকেট নিয়ে ছিলেন পাকিস্তানের সেরা বোলার।
এর আগে টস হেরে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের শুরুটা ছিল দারুণ। মাজ সাদাকাতের বিধ্বংসী সূচনায় তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমানকে ছন্নছাড়া দেখাচ্ছিল। পঞ্চম ওভারে বোলিংয়ে আসেন নাহিদ রানা। কিন্তু শুরুতে তিনিও নিজেকে ঠিক মেলে ধরতে পারেননি। প্রথম তিন ওভারেই দেন ৩২ রান।
পাকিস্তান ৬.৪ ওভারেই তুলে ফেলে দলীয় ফিফটি। তখন শাহিবজাদার রান মাত্র ৯, বাকি সবই সাদাকাতের ব্যাট থেকে। উইকেটের চারপাশে শট খেলতে খেলতে তরুণ এই ব্যাটসম্যান দ্যুতি ছড়ান। ৩১ বলেই তুলে নেন ফিফটি এবং আক্রমণের ধার বজায় রাখেন। ১২.২ ওভারে পাকিস্তান দলীয় একশ রানে পৌঁছে যায়—যেখানে সাদাকাতের একার রানই ৭৫, আর শাহিবজাদার মাত্র ১৮।
বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরাতে দরকার ছিল একটি ব্রেকথ্রু। অধিনায়ক মিরাজ সেই কাজটাই করেন ১৩তম ওভারে। তার বলে স্কুপ করতে গিয়ে হাওয়ায় ক্যাচ তুলে দেন সাদাকাত (৭৫) । লিটন দাস সহজ ক্যাচটি তালুবন্দি করলে বাংলাদেশ শিবিরে ফেরে স্বস্তি। ৪৬ বলে ৬ চার ও ৫ ছক্কায় সাজানো ছিল বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানের ইনিংসটি।
ওপেনিং জুটি ভাঙার পর পাকিস্তানকে চাপে ফেলতে থাকে বাংলাদেশ। পরের ৬৫ বল পর্যন্ত কোনো বাউন্ডারি হজম করেননি বোলাররা। শাহিবজাদা থিতু হলেও বড় কিছু করতে পারেননি। আক্রমণ বাড়াতে গিয়ে তাসকিনের বলে ৩১ রান করে ক্যাচ দেন তিনি। অন্যদিকে নাহিদ দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে প্রথম ওভারেই সাফল্য পান। তার বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ৬ রানে আউট হন শামিল হোসেন।
১৯ রানে ৩ উইকেট হারানো পাকিস্তান সেই ধাক্কা সামলে নেয় সালমান আগা ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের ব্যাটে। চতুর্থ উইকেটে তারা গড়েন ১১৫ বলে ১০৯ রানের জুটি। তাদের ব্যাটেই বড় সংগ্রহের পথে এগোচ্ছিল পাকিস্তান। তবে মিরাজের এক ওভারেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। প্রথমে চতুরতায় সালমান আগাকে (৬৪) রান আউট করেন তিনি, এরপর রিজওয়ানকে (৪৪) মিড উইকেটে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেন।
ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন সালমান; বল নাগালের মধ্যে পেয়ে থ্রোতে স্টাম্প ভেঙে দেন মিরাজ। আউটটি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটিই ছিল সেরা সিদ্ধান্ত। আউট মেনে নিতে না পেরে ক্ষোভে হেলমেট ও গ্লাভস ছুঁড়ে মারেন সালমান, ব্যাটও আঘাত করেন মাটিতে।
মিরাজের ওই ওভারে জোড়া উইকেটেই বাংলাদেশের দিকে ম্যাচের পাল্লা হেলে পড়ে। এরপর শেষটা হয়ে ওঠে আরও রঙিন। মিরাজের সাফল্যের পর রিশাদ হোসেনের লেগ স্পিন সামলাতেই পারেননি পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা। টপাটপ উইকেট তুলে পাকিস্তানকে এলোমেলো করে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৪৩ রানে শেষ ৭ উইকেট হারায় অতিথিরা।
প্রথম ম্যাচে নাহিদ রানা একাই চমকে দিয়েছিলেন পাকিস্তানকে। এবার দুই স্পিনার রিশাদ ও মিরাজই নায়ক। রিশাদ নেন ৩টি এবং মিরাজ ২টি উইকেট। দুটি শতরানের জুটি গড়ার পরও পাকিস্তানকে তিনশ রানের নিচে আটকে রাখার কৃতিত্ব তাই পুরোপুরি বাংলাদেশের বোলারদেরই।
মিরাজ ১০ ওভারে ৩৪ রান দিয়ে নেন ২ উইকেট। রিশাদ ৫৬ রানে শিকার করেন ৩টি উইকেট। আর তিন পেসার তাসকিন, মোস্তাফিজুর রহমান ও নাহিদ রানা নেন একটি করে উইকেট।
বোলিংয়ে ৩ উইকেট ও ব্যাটিংয়ে ঝড় তুলে ৭৫ রান করে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হয়েছেন সাদাকাত।