ক্যাম্পাস

ইবি শিক্ষিকা হত্যা: সিসিটিভিতে মিলল নতুন প্রশ্ন

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। গত ৪ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের ২২৬ নম্বর কক্ষে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।  সিসিটিভি ফৃটেজ অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিভাগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন থাকলেও হত্যার সময় বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বিভিন্ন কাজে বিভাগ ছেড়ে বাইরে ছিলেন। এতে অফিস ব্লকে শিক্ষিকা রুনা একা থাকায় তাকে হত্যার সুযোগ পেয়ে যায় অভিযুক্ত ফজলু। তবে ঠিক ওই সময় শিক্ষক–কর্মকর্তাদের একসঙ্গে বিভাগ ত্যাগ করা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভবনের নিচে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঘটনার দিন বিকেল ৩টা ৩৮ মিনিটে শিক্ষক হাবিবুর রহমান বিভাগ ত্যাগ করেন। এরপর বিকেল ৩টা ৪১ মিনিটে বিভাগের কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক এবং কর্মচারী ফজলু ও সোহাগ বিপরীত পাশের গেট দিয়ে ভবনটি ছেড়ে যান। যাওয়ার সময় তারা বিভাগের নৈশপ্রহরী সুমনের কাছে দায়িত্ব দিয়ে যান।

ঘটনার মাত্র তিন মিনিট আগে, বিকেল ৪টা ৯ মিনিটে সুমনও একই গেট দিয়ে বিভাগ ছেড়ে বেরিয়ে যান। একই সময় ভবনের সামনের গেট দিয়ে আরেক কর্মচারী মিজানকে ভবনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। তিনি দ্বিতীয় তলার ঘটনাস্থলের সামনে দিয়ে তৃতীয় তলার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে উঠে যান।

এর আগে বিকেল ৪টা ১ মিনিটে ফজলুকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কিচেন রুম থেকে পকেটে পলিথিনে মোড়ানো একটি ‘অজ্ঞাত বস্তু’ নিয়ে বের হতে দেখা যায়। এরপর তাকে আর সেখানে ফিরতে দেখা যায়নি। তার আগে ওই কক্ষে তাকে কিছু সময় লুকোচুরি ও পায়চারি করতে দেখা যায়।

পরে বিকেল ৪টা ৪ মিনিটে ফজলু তৃতীয় তলা থেকে নেমে দ্বিতীয় তলায় শিক্ষিকা রুনার কক্ষের দিকে যান। এরপর আবার ৪টা ৮ মিনিটে তিনি তৃতীয় তলায় ফিরে আসেন। পুনরায় ৪টা ১০ মিনিটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে দ্বিতীয় তলায় রুনার কক্ষে প্রবেশ করেন।

এর দুই মিনিট পর, বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে রুনা `আল্লাহ বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করেন। শব্দ শুনে ভবনের নিচে থাকা দুই আনসার সদস্য ও দুই শিক্ষার্থী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তখন কক্ষের ভেতরেই আটকে পড়েন অভিযুক্ত ফজলু। দরজা বন্ধ দেখে তারা দরজার উপর দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে শিক্ষিকা রুনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।

এ সময় ইফতারের আয়োজনস্থল থেকে বিভাগের তিন শিক্ষার্থীও সেখানে পৌঁছান। পরে তারা দরজা ভেঙে কক্ষে ঢুকে ফজলুকে নিজের গলায় ছুরি চালানোর চেষ্টা করতে দেখেন। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের দাবি, গণপিটুনি থেকে বাঁচতেই ফজলু আত্মহত্যার নাটক করেছিলেন।

এর আগে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিভাগের শিক্ষক শ্যাম সুন্দর সরকারও বিভাগ ত্যাগ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন বিভাগের কর্মকর্তারা।

সমাজকল্যাণ বিভাগে বর্তমানে সভাপতি রুনার সঙ্গে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। এছাড়া, সহকারী রেজিস্ট্রার মোজাম্মেল হক, সেমিনার লাইব্রেরিয়ান ফজলুল হক, কর্মচারী ও কম্পিউটার অপারেটর সোহাগ এবং নৈশপ্রহরী সুমন দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ আগে দাপ্তরিক কাজে অদক্ষতার অভিযোগে সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিতকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলে বদলি করা হয়। আর অসদাচরণের অভিযোগে প্রায় এক মাস আগে অভিযুক্ত ফজলুর রহমানকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়েছিল।

শিক্ষার্থীরা বলেন, “ওইদিন বিভাগের উদ্যোগে ইফতার মাহফিল ছিল। সেখানে সব শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও ঘটনার সময় সবার একসঙ্গে বিভাগ ত্যাগ করা রহস্যজনক। বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।”

সহকারী রেজিস্ট্রার মোজাম্মেল হক জানান, “তিনি ম্যামের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ক্যাম্পাসসংলগ্ন শেখপাড়া বাজারে ফল কিনতে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ফজলুল হক ও সোহাগ ছিলেন। যাওয়ার সময় নৈশপ্রহরী সুমনের কাছে বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে যান।

তিনি আরো জানান, ফজলুল হক তার মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন এবং কর্মচারী সোহাগ পাশের বাজারে টিসিবির পণ্য আনতে গিয়েছিলেন।

নৈশপ্রহরী সুমন বলেন, “বাসায় জরুরি কাজ থাকায় ম্যামের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ঠিক বিকেল ৪টায় বিভাগ ছেড়ে বাড়ি গিয়েছিলেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজে তাকে ৪টা ৮ মিনিটে ভবনে দেখা যাওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে পরে তিনি সেখানে থাকার কথা স্বীকার করেন।

তিনি দাবি করেন, বিভাগে থাকার সময় ফজলু দ্বিতীয় তলায় গেলেও তার সঙ্গে দেখা হয়নি।

এদিকে নিহত শিক্ষিকা রুনার পরিবারে লোকজন বলছেন, “একজন শিক্ষককে কীভাবে বিভাগে একা রেখে সবাই চলে গেলেন—এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। ফজলুর রহমান কীভাবে জানলেন যে রুনা কক্ষে একা ছিলেন, সেটিও তদন্ত করা জরুরি।”

পরিবারের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।