জাতীয়

সদরঘাটে স্বস্তির ঈদযাত্রা, নেই বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ

পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন মানুষ। তবে, প্রতি বছরের মতো এবার সদরঘাটে নেই সেই চেনা ভোগান্তি বা উপচে পড়া ভিড়। ফলে, অনেকটা স্বস্তিতেই নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। প্রতিবার ঈদযাত্রায় বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ শোনা গেলেও এবার তেমন অভিযোগ নেই। লঞ্চ মালিকরা জানিয়েছেন, সরকারের অনুরোধে ঈদের সাত দিন তারা বিশেষ ছাড়ে যাত্রী পরিবহন করবেন।

সোমবার (১৬ মার্চ) ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীরা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে লঞ্চে উঠছেন। ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তৎপর রয়েছেন। নির্ধারিত সময়েই যাত্রীরা লঞ্চে উঠতে পারছেন এবং নৌযানগুলোও পর্যাপ্ত যাত্রী নিয়ে ঘাট ছাড়ছে।

ভোলাগামী এমভি আল ওয়ালিদ-৪ লঞ্চের যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী সাফিন রহমান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “প্রতিবছর ঈদের সময় সদরঘাটে পা রাখার জায়গা থাকে না। কিন্তু, এবার চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। কোনো ধাক্কাধাক্কি ছাড়াই লঞ্চে উঠতে পেরেছি। সবচেয়ে বড় কথা, ডেক বা কেবিনের ভাড়া নিয়ে কোনো দরাদরি করতে হয়নি। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ সরকার নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু কমও রাখছে। পরিবার নিয়ে এমন স্বস্তিতে আগে কখনো বাড়ি যাইনি। সুন্দর ঈদযাত্রার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।”

বরিশালগামী এমভি ঈগল পাখি-১০ লঞ্চের যাত্রী এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমন হাসান বলেন, “প্রতিবছর ঈদযাত্রায় অনেক ভোগান্তি হয়। তবে এবার পরিবেশ ভালো মনে হয়েছে। মা’কে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি ঈদ করতে। বাড়তি ভাড়ার যে ভয়টা ছিল, এবার সেটা নেই। বেশ শান্তিতেই কেবিনে সিট পেয়েছি। আশা করছি এবারের ঈদযাত্রা আরামদায়ক হবে।”

চাঁদপুরগামী ময়ূর-৭ লঞ্চের যাত্রী রাবেয়া বেগম বলেন, “আগে ঈদের সময় যাত্রীদের হুড়োহুড়ি থাকত। এবার তেমনটা দেখিনি। আমরা শান্তিতেই লঞ্চে উঠতে পারছি, আর বাড়তি ভাড়াও চায়নি।”

এমভি আল ওয়ালিদ-৪ লঞ্চের ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানান, এখনো যাত্রীর চাপ তেমন পড়েনি। তবে আগামীকাল থেকে যাত্রী বাড়তে পারে, কারণ তখন থেকে পোশাকশ্রমিকদের ছুটি শুরু হবে। তিনি বলেন, “সদরঘাটের চাপ কমাতে এ বছর বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন লঞ্চঘাট এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সদরঘাটের চাপ কিছুটা কমেছে।”

এমভি পারাবত লঞ্চের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিক ভূঁইয়া বলেন, “ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। সরকারের অনুরোধে ঈদের সাত দিনের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো কিছু জ্বালানি সংকট রয়েছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এর সমাধান হবে।”

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে সদরঘাট এলাকায় পুলিশের নিরাপত্তা বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার সাঈদ ইবনে রেজা বলেন, “আমরা এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে তৎপর রয়েছি। সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারি চলছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে আমাদের টিম সমন্বয় করে কাজ করছে। কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

ঈদযাত্রা ঘিরে যাত্রীসেবায় বেশ কিছু নতুন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, “নতুন সরকারের সময়ে যাত্রীসেবা উন্নত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সদরঘাট টার্মিনালে ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা, ট্রলি এবং হুইলচেয়ার সুবিধা চালু করা।

তিনি জানান, ঈদের আগে পাঁচ দিন ও ঈদের পরে পাঁচ দিন—মোট ১০ দিন যাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে কুলি সেবা দেওয়া হবে। এসব কুলিকে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্বভাবে মজুরি দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে, যাতে যাত্রীরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন। এছাড়া, অসুস্থ, অক্ষম ও বয়স্ক যাত্রীদের সুবিধার্থে হুইলচেয়ারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সীমিতসংখ্যক হুইলচেয়ার ছিল, এবার সদরঘাটের ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইলচেয়ার রাখা হবে। এসব ব্যবহারে সহায়তা করবেন ক্যাডেট সদস্যরা।

ঈদযাত্রার চাপ সামাল দিতে সদরঘাটে অতিরিক্ত আরো দুটি ঘাট চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রীদের স্বস্তি দিতে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।