ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রথম দিন ১৭৫ একরের বিশাল, অচেনা ক্যাম্পাস আর নতুন মুখের ভিড়। সেই ভিড়েই প্রথম পরিচয় হয়েছিল হাসানুর রহমান ও রাফিউল আলম রাফির। আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এই পরিচয় যে কেবল বন্ধুত্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পেশাজীবনের সাফল্যের পথেও পাশাপাশি হাঁটাবে—সেটা হয়তো সেদিন তারা নিজেরাও ভাবেননি।
ছয় বছরের দীর্ঘ পথচলায় একসঙ্গে ক্লাস, আড্ডা, খুনসুঁটি আর একই রুমে রাত জেগে পড়াশোনা, সবকিছুই ভাগাভাগি করেছেন তারা। সেই বন্ধুত্বই এবার রূপ নিয়েছে পেশাগত সাফল্যে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অ্যাডভোকেটশিপ এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তারা দুজনসহ তাদের ব্যাচের ৪০ জন এখন ‘অ্যাডভোকেট’। তবে এখানেই থেমে থাকেননি তারা। ২০২৫ সালে আয়কর আইনজীবী (ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন।
হাসানুর রহমানের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশায়, আর রাফিউল আলম রাফির বাড়ি পিরোজপুর সদরে। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও ইবির আইন বিভাগ তাদের এক সুতোয় বেঁধেছিল। দুজনেই স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। লক্ষ্যনিষ্ঠ এই পথচলায় ২০২৪ সালে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২০২৫ সালে আয়কর আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই তারা বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। অবশেষে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত বার কাউন্সিলের ফলাফলে তারা পৌঁছে যান সফলতার চূড়ান্ত ধাপে।
অর্জনের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তারা বলেন, “আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া। শুরু থেকেই এই পথেই এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ছিল। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য আর অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে আমরা ভীষণ আনন্দিত। পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুপ্রেরণা এবং সমর্থনই আমাদের এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।”
বিশেষায়িত আয়কর আইন পেশা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, “দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করতে আয়কর খাতের ভূমিকা অনেক বড়। এখানে স্বচ্ছভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও আছে। ডকুমেন্টভিত্তিক কাজ হওয়ায় দক্ষতা প্রমাণের সুযোগও বেশি।”
তবে এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। আইন নিয়ে পড়াশোনা করলেও আয়কর ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্টিংয়ের জটিল বিষয়গুলো ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ। দক্ষ সিনিয়রের অভাব ও ভিন্নধর্মী সিলেবাসের কারণে বহু রাত তারা নির্ঘুম কাটিয়েছেন সঠিক দিকনির্দেশনার খোঁজে। প্রচলিত অ্যাডভোকেট হওয়ার সামাজিক চাপের বাইরে গিয়ে বিশেষায়িত একটি খাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতি বলতে গিয়ে তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। একই রুমে থাকা, পরীক্ষার আগের রাতে একে অপরকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়া, ব্যর্থতার সময় পাশে দাঁড়ানো, এসব স্মৃতির সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে আজকের এই সাফল্য। তাদের ভাষায়, “বন্ধু যখন সহযোদ্ধা হয়, তখন কঠিন পথও সহজ মনে হয়।”
নবীনদের উদ্দেশ্যে তাদের পরামর্শ হলো লক্ষ্য স্থির রেখে পরিকল্পিতভাবে পরিশ্রম করতে হবে। আইনের মৌলিক বিষয়ে দক্ষতার পাশাপাশি অভিজ্ঞদের কাছ থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা নেওয়াই সাফল্যের চাবিকাঠি।