জাতীয়

বৃষ্টি কোনো বাধা নয়, আল্লাহর রহমত: জাতীয় ঈদগাহে এক অদম্য বিশ্বাসের গল্প

শনিবার (২১ মার্চ) সকালের আকাশ মেঘলা, ঝরছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। তবুও সেই বৃষ্টি যেন থামাতে পারেনি মানুষের অদম্য আগ্রহ। পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাতে অংশ নিতে সকাল সাড়ে ৮টার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় জাতীয় ঈদগাহ প্রাঙ্গণ। ভেজা মাটি, কাদা আর বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা একত্রিত হন। একটাই লক্ষ্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা ছুটে আসতে থাকেন। কেউ ছাতা হাতে, কেউ পলিথিনে মাথা ঢেকে বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করছেন। আবার অনেকে ভিজেই দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘ লাইনে। কিন্তু কারও মুখে বিরক্তি নেই বরং আছে এক ধরনের প্রশান্তি, এক ধরনের আত্মতৃপ্তি।

কেরানীগঞ্জ থেকে আসা আব্দুল করিম (৫৫) বললেন, আমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এসেছি। বৃষ্টি কোনো বাধা না। বরং এটা রহমত। এই বৃষ্টির মধ্যেই নামাজ পড়তে পেরে ভালো লাগছে।

তার কথায় যেন প্রতিফলিত হয় হাজারো মানুষের অনুভূতি- এই আসা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি এক ধরনের আত্মিক টান।

নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দোয়েল চত্বর, মৎস্য ভবন ও জাতীয় প্রেস ক্লাব সংলগ্ন সড়ক বন্ধ রাখা হয়। ফলে অনেক মুসল্লিকে হেঁটে ঈদগাহে পৌঁছাতে হয়েছে। প্রবেশের আগে তিন ধাপে তল্লাশি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারিতে ধাপে ধাপে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

তবে এত কড়াকড়ির মধ্যেও কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মুসল্লিরা ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করেছেন। সবাই যেন বুঝে নিয়েছেন যে এই নিরাপত্তা তাদের নিজেদের জন্যই।

নারায়ণগঞ্জের মো. রাশেদ (৩২) বলেন, ভোর ৬টায় বের হয়েছি। রাস্তা বন্ধ থাকায় কিছুটা কষ্ট হয়েছে, কিন্তু এখানে এসে সব ভুলে গেছি। একসঙ্গে এত মানুষের সঙ্গে নামাজ পড়ার অনুভূতিটা আলাদা।

হাইকোর্ট এলাকা ঘিরেও দেখা যায় মানুষের দীর্ঘ সারি। কেউ রাস্তার পাশে জায়নামাজ বিছিয়ে বসে আছেন, কেউ দোয়া পড়ছেন, আবার কেউ নীরবে অপেক্ষা করছেন। এই অপেক্ষার মধ্যেও ছিল এক ধরনের আনন্দ, এক ধরনের প্রস্তুতি।

কদমতলীর জাকির হোসেন (৪০) বলেন, প্রতিবারই চেষ্টা করি জাতীয় ঈদগাহে নামাজ পড়তে। আজ বৃষ্টি ছিল, তবুও পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কষ্ট করলে তাতেই আনন্দ।

বয়সের ভার উপেক্ষা করে এসেছেন নূর ইসলাম (৬০)। তিনি বলেন, বয়স হয়েছে, তবুও এসেছি। এখানে লাখো মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ পড়ার অনুভূতি অন্যরকম। মনে শান্তি পাই।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে সাইফুল ইসলাম (২৮) বলেন, তিন জায়গায় চেকিং হয়েছে। এতে আমাদেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এত বড় আয়োজন, তারপরও সবকিছু সুন্দরভাবে হয়েছে।

আবুল কালাম (৪৫) বলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে অনেকক্ষণ, কিন্তু কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। সবাই নিয়ম মেনে চলেছে, এটা ভালো লেগেছে।

কেরানীগঞ্জের মিজানুর রহমান (৩৫) বলেন, বৃষ্টি, কাদা-সব উপেক্ষা করে মানুষ এসেছে। এটা ঈদের প্রকৃত চিত্র। সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এসেছে।

হুমায়ুন কবির (৫০) বলেন, আজকের দিনটা শুধু নামাজ না, একসঙ্গে থাকার দিন। এই পরিবেশটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।

নামাজ শুরুর মুহূর্তে পুরো এলাকা এক অন্য আবহে ঢেকে যায়। লাখো মানুষ একসঙ্গে তাকবিরে কণ্ঠ মেলান। বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যেই সবাই রুকু-সিজদায় ঝুঁকে পড়েন। ভেজা মাটিতে কপাল রেখে সিজদা করার সেই দৃশ্য ছিল এক অনন্য অনুভূতি।

এখানে নেই কোনো ভেদাভেদ। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে। এই সমতাই ঈদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। একজন দিনমজুর আর একজন কর্মকর্তা একই সারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন, এই দৃশ্যই সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্যকে তুলে ধরে।

ঈদের আনন্দ সবসময় সহজ নয়। কখনো তা আসে কষ্টের মধ্য দিয়ে। এই ঈদে মানুষ সেই কষ্টকে সানন্দে গ্রহণ করেছে। বৃষ্টি, কাদা, দীর্ঘ অপেক্ষা সব পেরিয়ে তারা নামাজ আদায় করেছেন। আর সেই কারণেই এই আনন্দ আরও গভীর হয়েছে।

অনেকেই বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে দেখেছেন। এই বৃষ্টিভেজা ঈদ যেন সেই রহমতেরই প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিও যেন এই আনন্দে অংশ নিয়েছে।

নামাজ শেষে যখন মুসল্লিরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন, তখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও আর বিরক্তিকর মনে হয় না। বরং তা হয়ে ওঠে আনন্দেরই অংশ।

এই দৃশ্য যেন একটাই বার্তা দেয় প্রতিকূলতা যতই থাকুক, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আর ভালোবাসা মানুষকে থামাতে পারে না।

বৃষ্টিভেজা এই সকাল তাই শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি এক অদম্য বিশ্বাসের গল্প। যেখানে মানুষ কষ্টকে উপেক্ষা করে, ভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে, শুধু একটি উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি।