রাজধানীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র জাতীয় চিড়িয়াখানায় ঈদের ছুটিতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। ঈদের দ্বিতীয় দিনে প্রথম দিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মানুষ ভিড় জমিয়েছে।
শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর পরিবারের আনন্দঘন সময় কাটানোর দৃশ্য যেমন চোখে পড়ার মতো, তেমনি অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত সুবিধা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে দর্শনার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে অসন্তোষও।
সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন মিরপুরের এই চিড়িয়াখানায়। কেউ সন্তানদের নিয়ে, কেউবা বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এখানে আসেন। চিড়িয়াখানার বিভিন্ন খাঁচা ও উন্মুক্ত পরিবেশে বাঘ, সিংহ, হাতি, বানর, হরিণসহ নানা প্রাণী দেখে আনন্দে মেতে ওঠে শিশুরা। যারা এতদিন প্রাণী দেখেছে কেবল বই বা ইউটিউবের পর্দায়, তারা বাস্তবে প্রাণীগুলো দেখে উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে।
এখানে খোলা পরিবেশ ও সবুজ প্রকৃতির মাঝে কিছুটা স্বস্তির খোঁজে আসেন অভিভাবকরা। কিন্তু সেই স্বস্তি অনেকাংশেই ম্লান হয়ে যায় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, বসার জায়গার তীব্র সংকট থাকায় অনেককে গাছের নিচে বা অপরিচ্ছন্ন স্থানে বসতে হচ্ছে। অনেক পরিবার মাদুর বিছিয়ে খোলা জায়গায় বসে দুপুরের খাবার সারছেন।
ঢাকার পল্লবী থেকে আসা মাসুম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “প্রকৃতির নির্যাস পেতে আর পাখি দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ে বসার জায়গা তো দূরের কথা, কিছুই ঠিকমতো দেখতে পারিনি। পরিচ্ছন্নতার দিকেও আরও নজর দেওয়া যেত।”
চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার রাইজিংবিডিকে জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। তিনি বলেন, “প্রথম দিনে প্রায় ৮০ হাজার দর্শনার্থী এসেছিলেন। আজ দেড় লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। বিকেল পাঁচটার পর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।
তিনি আরও জানান, চিড়িয়াখানায় খাদ্যসামগ্রী ও পলিথিন নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও অনেকেই তা মানছেন না। এ কারণে ভেতরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। দর্শনার্থীদের সচেতন করতে মাইকিং ও নজরদারি চালানো হচ্ছে, পাশাপাশি বাইরে যারা এসব পণ্য বিক্রি করছেন তাদেরও লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
দর্শনার্থীদের অভিযোগের আরেকটি বড় বিষয় ছিল যানবাহন ব্যবস্থা। সাভার থেকে পরিবারসহ আসা আলমগীর হোসেন বলেন, “অনেক দূর আগেই যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে হেঁটে আসা খুব কষ্টকর। এত ভিড়ের কারণে ঠিকমতো কিছু দেখতেও পারিনি।”
নারী দর্শনার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা না থাকাও বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। অনেকে জানান, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে শিশু ও নারীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেগুনবাগিচা থেকে আসা মুসলিমা বেগম বলেন, “চিড়িয়াখানায় পর্যাপ্ত সুবিধা থাকা উচিত ছিল। প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু ব্যবস্থা থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বিদেশি চিড়িয়াখানার মতো ভেতরে পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা গেলে ভালো হতো।”
এদিকে বৃষ্টির কারণে চিড়িয়াখানার বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখা গেছে, যা দর্শনার্থীদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, জনবলের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিচালক জানান, “পর্যাপ্ত জনবল থাকলে শিফটভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করে সেবার মান আরও উন্নত করা যেত। বর্তমানে সীমিত জনবল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে, যার ফলে মাঝে মাঝে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে।”
পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে র্যাব, পুলিশ, আনসার সদস্যসহ চিড়িয়াখানার নিজস্ব কর্মীরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান তিনি। তবে সবকিছুর পরও দর্শনার্থীদের সচেতনতা ছাড়া পুরো পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন।
ঈদের ছুটিতে এমন বিপুল মানুষের সমাগম চিড়িয়াখানার জনপ্রিয়তারই প্রমাণ বহন করে। তবে একই সঙ্গে এটি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে এসেছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, বসার জায়গা, পরিচ্ছন্নতা, নারী ও শিশুদের জন্য সুবিধা এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা আরও আনন্দদায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন দশনার্থীরা।