রাইজিংবিডি স্পেশাল

বেঁচে থাকার সংগ্রামে মিলিয়ে যায় উৎসবের আনন্দ

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। অধিকাংশ মানুষ যখন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন রাজধানীর রাস্তার মোড় ও ফুটপাতগুলোতে দৃশ্য অন্যরকম। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের কাছে ঈদ অন্য দিনগুলোর মতো নিরানন্দের। বরং, বেঁচে থাকার সংগ্রামে মিলিয়ে যায় তাদের উৎসবের আনন্দ।

রবিবার (২২ মার্চ) সকালের রোদ তখনো পুরোপুরি তেজ ছড়ায়নি। গুলিস্তান মোড়ে দেখা গেল রাজমিস্ত্রি মফিজুল ইসলামকে। হাতে কাজের যন্ত্রপাতি, পাশে বালু-সিমেন্টের বস্তা। ঈদের দিনেও কাজ করছেন। 

মফিজুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমের এ প্রতিবেদককে বললেন, “কাজ বন্ধ রাখলে পেট বন্ধ থাকে। আজকে একটু কাজ পাইছি, তাই বের হইছি। ঈদে আনন্দ করলে তো চাল কিনতে পারব না।”

নয়া বাজারে কথা হয় কাঠমিস্ত্রি রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি একটি দোকানের সামনে কাঠ কাটছেন। হাতুড়ির শব্দে গমগম করছে চারপাশ। 

রফিকুল ইসলাম বলেন, “গ্রামে গেলে দুই-তিন দিন কাজ বন্ধ থাকে। এই শহরে থাকলে অন্তত কিছু আয় হয়। বাচ্চাদের জন্য টাকা পাঠাইতে হবে, এটাই বড় কথা।”

একই রকম চিত্র দেখা যায় মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও সদরঘাট এলাকায়। দিনমজুর, ভ্যানচালক, হকার অনেকেই ঈদের দিনটিকে বাড়তি আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখেন। কারণ, অন্য দিনগুলোতে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। ঈদের দিন মানুষ বাইরে বের হয়, ঘোরে, কেনাকাটা করে; সেই ভিড়েই একটু বেশি আয় করার আশায় তারা ছুটে বেড়ান।

পল্টনে এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক হেলালের সঙ্গে। সকাল থেকেই রিকশা চালাচ্ছেন তিনি। হেলাল বলেন, “আজ ভাড়া একটু বেশি পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ ঘুরতে বের হচ্ছে। এই দিনটাই আমাদের জন্য ভালো।”

বেইলি রোডের পাশে এক চায়ের দোকানে কাজ করেন ৩২ বছর বয়সী সুমন। ঈদের দিনেও তার ছুটি নেই। ভোর থেকেই ব্যস্ত। 

সুমন বলেন, “সবাই নতুন জামা পরে, আমরা দেখি। মালিক যদি খুশি হয়, হয়ত এক প্লেট সেমাই খাওয়াবে”। মুখে লজ্জা মেশানো হাসি তার।

গুলিস্তানের ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করছিলেন রহিম। নিজের জন্য কিছু কিনেছেন কি না, জানতে চাইলে হেসে বলেন, “নিজের কথা ভাবলে ব্যবসা হবে না। আগে বিক্রি করি, পরে যদি কিছু থাকে, তখন দেখা যাবে।”

শহরের অভিজাত এলাকার ফাঁকা রাস্তায় যখন অটোরিকশা ছুটে চলে, তখন চালকদের মুখেও শোনা যায় একই কথা— ‘ঈদ মানে আমাদের জন্য কাজের দিন।’ অনেকেই গ্রামের বাড়ি যেতে পারেননি শুধু আয় বন্ধ হয়ে যাবে, এই ভয়ে। পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তবে, এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে নেন তারা। কেউ কেউ দুপুরে একটু ভালো খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউবা পুরনো কাপড় পরিষ্কার করে পরে নেন। কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন খাবার বা কাপড় দিলে সেটাই হয়ে ওঠে তাদের ঈদের আনন্দ।

সামাজিক বৈষম্যের এই চিত্র নতুন নয়। তবু প্রতি বছর ঈদ এলেই তা যেন নতুন করে চোখে পড়ে। একদিকে বিলাসী উদযাপন, অন্যদিকে ন্যূনতম চাহিদা পূরণের লড়াই—এই বৈপরীত্যই নগরজীবনের কঠিন বাস্তবতা।

পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারের বাসিন্দা তৌফিক হাসান বলেন, “ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির কথা বলা হয়। কিন্তু, সেই আনন্দ কতটা পৌঁছায় ছিন্নমূল মানুষের কাছে? তাদের জীবনে ঈদ মানে এখনো কাজ, ঘাম আর টিকে থাকার যুদ্ধ।”

এর মধ্যেই শহরের কোথাও কোথাও দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্য। ফুটপাতের কোণে কয়েকজন একসঙ্গে বসে ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন সেমাই। নেই নতুন জামা, নেই বড় আয়োজন; তবু আছে এক ধরনের শান্তি। হয়ত সেখানেই লুকিয়ে থাকে তাদের ছোট্ট ঈদ, নীরব কিন্তু গভীর।