বসন্তের শুরুতেই বৃষ্টির দেখা মিলিছে। বৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে কুঁড়ি মেলতে শুরু করেছে চা বাগানের গাছগুলো। গাঢ় সবুজে ছেয়ে যাচ্ছে চারপাশ। এতে চা বাগানের শ্রমিক থেকে শুরু করে মালিকের মুখে ফুটেছে হাসি।
বছরের এ সময় তারা এমন বৃষ্টির প্রতীক্ষা করেন। বাগানের গাছে গাছে চা পাতার একেকটা কুঁড়ি মালিক ও শ্রমিকের চোখে স্বপ্ন বুনে দেয়। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হবে, গাছে গাছে কুঁড়ি গজাবে। কুঁড়ি যত বেশি সংগ্রহ হবে, বাড়বে উৎপাদন।
হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার আমতলী চা বাগানে ১২ মার্চ থেকেই এ মৌসুমের উৎপাদন শুরু হয়েছে। শ্রমিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে উঁচু ও ঢালু পাহাড়ি জমি থেকে চা পাতা সংগ্রহ করছেন। প্রক্রিয়াজাতের জন্য সেগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কারখানায়। বাগানে কর্মরত ফ্যাক্টরি হেড ক্লার্ক এম কায়সার ও বিকাশ দেব বলেন, ম্যানেজার স্যার ও অন্যন্য কর্মকর্তা মিলে শ্রমিকদের প্রেরণা জোগাচ্ছেন। শ্রমিকরা মনের আনন্দে চা পাতা সংগ্রহ করছেন। এখন দিনদিন উৎপাদন বাড়বে।
জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে মাধবপুর, চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ, বাহুবল উপজেলায় রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। এখানে ছোট-বড় মিলে ৪১টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানের বাসিন্দা প্রায় দেড় লাখ। এর মধ্যে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে প্রায় ৩২ হাজার শ্রমিক চা পাতা উত্তোলনে জড়িত।
এ মৌসুমে প্রথম হবিগঞ্জে ১৪ মার্চ সকালে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়। এরপর কয়েক দফা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির স্পর্শে জেগে উঠতে শুরু করেছে চা পাতার কুঁড়ি। এরপরই মূলত শুরু হয় চা পাতার উৎপাদন।
দেশের অন্যান্য বাগানসহ সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায় অবস্থিত বাগানগুলোতে ব্ল্যাক টি উৎপাদন হচ্ছে ব্রিটিশ আমল থেকে। সেই সময় থেকেই বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে চা-পাতার উৎপাদন শুরু হয়, শেষ হয় ডিসেম্বর মাসে। উৎপাদন শেষে গাছগুলো নানাভাবে পরিচর্যা করা হয়ে থাকে।
প্রতি মৌসুমে হবিগঞ্জের বাগানগুলো প্রায় দেড় কোটি কেজি চা-পাতা উৎপাদন করে। নতুন করে চারা রোপণ করে চা-পাতার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বাগান কর্তৃপক্ষ নানাভাবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। নিয়মমাফিক বৃষ্টির সাথে রয়েছে চা-পাতা উৎপাদনের সম্পর্ক। এখানে অতি বৃষ্টি হলে হবে না। নিয়ম অনুযায়ী বৃষ্টির সাথে উৎপাদনের ভালো-মন্দ নির্ভর করে। জানা গেছে, বৃষ্টির সাথে সম্পর্ক রেখে হবিগঞ্জের প্রায় ৪১টি বাগানে চা পাতার উৎপাদন চলছে।
বাহুবল উপজেলার আমতলী চা বাগানের ব্যবস্থাপক সোহেল রানা পাঠান বলেন, বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি হবিগঞ্জের চা-বাগানের মালিক-শ্রমিক সবার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক এনে দিয়েছে। কারণ, বৃষ্টি ছাড়া উঁচু আর ঢালু স্থানে আড়াই থেকে তিন ফুট গাছে কুঁড়ি আসবে না। বৃষ্টিতে গাছে গাছে কুঁড়ি ছাড়তে শুরু করেছে। গাছের বড় কুঁড়িগুলো শ্রমিকরা সংগ্রহ করছেন। নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফ্যাক্টরিতে। প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। নিয়মিত বৃষ্টি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।
চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের ব্যবস্থাপক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, চা বাগানের জন্য গড়ে ২৫ দশমিক ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। তাপমাত্রা চাই ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। তা না হলে সমস্যা তৈরি হবে।
ডুলনা চা বাগানের ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, আমরা উৎপাদন শুরু করেছি। অবস্থা ভালো। আমরা যারা চা বাগানে কাজ করি, তারা এমন আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকি যে, কখন কুঁড়ি গজাবে, তখন গাছ সবুজ হবে।
তিনি বলেন, বসন্ত এলে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখে হৃদয়ে যেভাবে দারুণ অনুভূতি হয়, ঠিক তেমনি বৃষ্টির পর চা গাছ নতুন কুঁড়িতে ভরে উঠতে দেখলে আমাদেরও হৃদয় গভীর আনন্দে ভেসে যায়। এই নতুন কুঁড়ি চা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখবে।
দেউন্দি চা-বাগানের শ্রমিক বিনা সাঁওতাল বলেন, বছরের পর বছর ধরে গাছ থেকে চা-পাতা সংগ্রহ করছি। এটা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। তবে বৃষ্টির পরে যে কুঁড়িগুলো বের হয়, তা চকচকে সবুজ থাকে। বৃষ্টিতে গাছে কুঁড়ি ছাড়তে শুরু করেছে। যে চা গাছের কুঁড়িগুলো অন্যগুলোর থেকে বেশি বড় হয়ে গেছে, সেগুলো ইতোমধ্যে তোলা হয়ে গেছে। এভাবে উত্তোলন চলবে।
জেলার জগদীশপুর, রশিদপুর, লালচান্দ, পারকুল, সুরমা, চান্দপুর, চন্ডিছড়াসহ বিভিন্ন বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, বৃষ্টির দেখা পাওয়ায় তারা সবাই কমবেশি উৎপাদন শুরু করেছেন। তবে নিয়মিত বৃষ্টি না হলে উৎপাদনে বাধা তৈরি হবে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।