মো. সুলতান-ই-আলম। বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর একজন কনস্টেবল। কর্মরত রয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের বয়রা পুলিশ লাইন্সে। দায়িত্ব পালন করছেন নগরীর ব্যস্ততম শিববাড়ি মোড়ে। তিনি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিন কন্যা সন্তানের এই জনক পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনে নগরবাসীর জান-মালের নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন রাজপথে।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সবার ঈদ মানে আমাদের ঈদ। আমরা যদি পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে গ্রামে যাই, তাহলে শহরের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে কারা।”
শুধু সুলতান-ই-আলম নন, তার মতো খুলনায় হাজারো পুলিশ সদস্য এবার ঈদের ছুটিতে পরিবার ছেড়ে জানমালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অপ্রাপ্তি- পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ, নামাজ ও খাবারের সুযোগ হারানো। প্রাপ্তি- জনগণের নিরাপদ ঈদ নিশ্চিত করার মানসিক তৃপ্তি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের গৌরব। পুলিশ সদস্যদের অনেকে ঈদের দিনেও ১২-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
ঈদগাহে নামাজ না পড়ে রাস্তায় বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন পুলিশ সদস্যরা। নির্বিঘ্ন ঈদ উদযাপন নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশের সেবার আত্মতৃপ্তি লাভ করেন তারা। ডিউটির ফাঁকে সহকর্মীদের সঙ্গে করেন ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। পুলিশ সদস্যদের জন্য উন্নত খাবারের আয়োজন ছিল কেএমপির পক্ষ থেকে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয় গত শনিবার (২১ মার্চ)। ঈদ পরবর্তী সময়েও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছে মানুষ। ব্যতিক্রম পুলিশ সদস্যরা। ঈদ কেন্দ্রিক নগরীর মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করছেন তারা। তাদের দায়িত্বের কাছেই যেন হার মানে ঈদের খুশি।
এবারের ঈদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে গিয়ে কেএমপির অধিকাংশ পুলিশ সদস্য ছুটি পাননি। তাদের ঈদ কাটছে স্বজনহীন কর্মব্যস্ততায়। পুলিশ সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টের জায়গা হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। অনেকেই বছরের পর বছর ঈদ করেন থানায়, ব্যারাকে কিংবা রাস্তায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। আর ভিডিও কলে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেই কাটে ঈদের আনন্দ।
শনিবার খুলনার বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের। কেএমপির ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত পুলিশ সদস্য আব্দুল কাদেরের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলা সদরে। দায়িত্ব পালন করছেন নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে।
স্বজনদের কাছে না পাওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, ট্রাফিক বিভাগের ১০৭ জন সদস্য ছুটি পেয়েছেন। সবাই ছুটিতে গেলে সড়কে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, ফলে ছুটি পাননি। ঈদুল আজহাতে ছুটি পেলে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারবেন এমন প্রত্যাশা করছেন তিনি।
সৈয়দপুর সদর উপজেলার ওমরপুর গ্রামের বাসিন্দা পুলিশ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান দুই মেয়ের জনক। ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত এই পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন বাংলা মডেল মোড়ে। তিনি জানান, দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদেরও ঈদ চলছে।
অপর পুলিশ সদস্য তৌহিদুজ্জামানের বাড়ি যশোরের বিরামপুর উপজেলায় করিসমাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায়। পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। ঈদে পরিবারের সদস্যরা গ্রামে গেলেও ছুটি না পাওয়ায় তিনি যেতে পারেননি। তৌহিদুজ্জামানে জানান, এমনিতেই ঈদের সময় সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যায়। এ কারণে ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব থাকে বেশি, এছাড়া এ বিভাগে জনবল কম ফলে এবার যারা ছুটি পেয়েছেন তারা আগামী ঈদে দায়িত্ব পালন করবেন। যারা এবার ছুটি পাননি ঈদুল আজহার ছুটি পাবেন, এভাবেই তাদের ঈদের ছুটি সমন্বয় করা হয়।
খুলনায় কর্মরত পুলিশ সদস্য মো. আসলাম জানান, পরিবার নিয়ে ঈদ আনন্দ উপভোগের আগ্রহ থাকলেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক সময় ছুটি কাটানো সম্ভব হয় না।
রূপসা কিসমত খুলনা ফাঁড়িতে কর্মরত সাতক্ষীরার জাহিদুর রহমান বলেন, “জনগণের নিরাপত্তার জন্য অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা হয় না। তারপরও মেনে নিতে হবে, কারণ এটাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।”
রূপসা থানায় কর্মরত এএসআই মো. জাকির হোসেনের গ্রামের বাড়ি যশোরের অভয়নগর। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশের চাকরি করি। ঈদে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করতে চাইলেও অনেক সময় সম্ভব হয় না। তারপরেও জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা এই ত্যাগ স্বীকার করে আসছি। এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও ত্যাগ।”
রূপসা কিসমত খুলনা ফাঁড়ির এএসআই ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এলাকার মো. আমিরুল ইসলাম জানান, ঈদের সময় স্ত্রী, সন্তান বাড়ি রেখে পুলিশের চাকরি করছি। ঈদের আনন্দকে ত্যাগ করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করাই আমাদের কাজ। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই ত্যাগ স্বীকার করা।”
রূপসা বাসস্ট্যান্ড ফাঁড়ির আইসি চুয়াডাঙ্গার জেলার মো. আকরামুল হক বলেন, “দায়িত্বের খাতিরে সব ঈদে পরিবারের কাছে যাওয়া সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে এবং জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা এই ধরনের ত্যাগ স্বীকার করছি। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থটাও তেমন প্রয়োজন। কোরবানি ঈদে ছুটি নিয়ে পরিবারের সাথে ঈদ করব।”