অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির বৈঠকে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে সংসদের বৈঠকে উত্থাপনের প্রস্তাব এসেছে। এক্ষেত্রে জুলাই জনআকাঙ্খা ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে অধ্যাদেশগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিল প্রণয়ন করা হবে। ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ হুবহু রাখার বিষয়ে বিশেষ কমিটির সকল সদস্য একমত পোষণ করেছেন। আগামী ২৯ মার্চ কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বুধবার (২৫ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ. এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম খান ও জি এম নজরুল ইসলাম।
কমিটি সূত্র জানায়, বৈঠকে এ পর্যন্ত ১২টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় বিভিন্ন মত এসেছে। তবে বেশির ভাগ অধ্যাদেশ সুপারিশ আকারে সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে। সেক্ষেত্রে কেউ কেউ কিছু অধ্যাদেশ হুবহু রাখার পক্ষে, কেউ কেউ কিছু ক্ষেত্রে কিছু সংশোধন-পরিবর্তন আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ হুবহু রাখার বিষয়ে বিশেষ কমিটির সকল সদস্য একমত পোষণ করেছেন। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩-৩৫ করা যায় কি না, বিরোধী দল থেকে এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে, কমিটির বেশির ভাগ সদস্য ৩২ বছর করার বিষয়ে মত দিয়েছেন। আলোচনা শেষে অধ্যাদেশগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট আকারে তা জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পেশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা জুলাই সুরক্ষা নিয়ে সবাই একমত হয়েছি। ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ নিয়ে কমিটির সব সদস্য একমত পোষণ করেছেন। এগুলো হুবহু সংসদে উপস্থাপন করা হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ররেছে। কমিটির বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, কিছু অধ্যাদেশ বর্তমান রূপেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিল আকারে এনে পাস করবে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ বিল উত্থাপন করা হবে। আর তৃতীয়ত, যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যাবে না, সেগুলো এই অধিবেশনে ‘ল্যাপস’ বা বাতিল হয়ে যাবে; যা প্রয়োজনে পরবর্তী অধিবেশনে নতুন বিল হিসেবে আসবে।”
সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা জুলাই জাতীয় সনদকে এখানে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছি। সাংবিধানিকতা রক্ষা এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিটি বিল অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শেষ হলেও দুদক আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।”
আগামী রবিবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে জুলাই বিপ্লব সংশ্লিষ্ট চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির সব সদস্য ঐকমত্য পোষণ করেছেন বলে জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “আমরা এরই মধ্যে ১২০টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছি। পর্যালোচনার ক্ষেত্রে জুলাই সনদ এবং দেশের সংবিধানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে কমিটির সবাই একমত হয়েছেন। অবশিষ্ট অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় আলোচনা করা হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব এসেছে বলে জানান বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন। তিনি বলেন, “সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী নতুন বিল পাসের আগে পুরনো অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে, যাতে আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।”
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য মতে, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। পরে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিনের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৫ মার্চ সংসদ অধিবেশনে সংসদে উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠিয়ে ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কোনো অধ্যাদেশ জারি করলে এরপর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে ওই অধ্যাদেশ তুলতে হয়। সংসদ গ্রহণ না করলে অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়।