‘কালো সোনা’ খ্যাত পেঁয়াজের বীজ চাষ করে ব্যাপক সাফল্যের আশা করছেন মনিরুল ইসলাম নামে এক যুবক। কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় প্রায় ২৮ বিঘা এবং কুমারখালী উপজেলাসহ উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় ও নওগাঁ জেলার ১৭ বিঘা জমিতে এই ফসল আবাদ করেছেন তিনি। তুলনামূলক বেশি লাভের সম্ভাবনা থাকায় অনেক কৃষকই এখন তার দেখাদেখি পেঁয়াজের বীজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এলাকাবাসীর কাছেও আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে পেঁয়াজের বীজ আবাদ।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি শেষ বর্ষের ছাত্র মনিরুল ইসলাম। কুমারখালী উপজেলার কবুরাট এলাকার মো. কিনাজ উদ্দিনের ছেলে তিনি।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বাড়াদি এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা পেঁয়াজ ফুলে পরাগায়নে ব্যস্ত। সারিবদ্ধভাবে সবাই একদিক থেকে আরেকদিকে ফুলের পরাগায়নের মাধ্যমে তাদের কার্য সম্পাদন করছেন।
কৃষি শ্রমিকরা জানান, পেঁয়াজ চাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ফুলে পরাগায়ন। আগে পেঁয়াজ ক্ষেতে প্রচুর পরিমাণে মৌমাছির দেখা মিলত। তবে, এখন মাঠে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মৌমাছি আসে না। এ কারণে হাত দিয়েই প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন করতে হচ্ছে।
তারা জানান, পেঁয়াজের বীজ চাষ সাধারণ পেঁয়াজ চাষের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং শ্রমনির্ভর। জমি প্রস্তুত, সেচ, আগাছা দমন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে এটি কৃষকের জন্য লাভজনক হয়ে ওঠে।
mমনিরুলের ক্ষেতে কাজ করছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা
মনিরুল ইসলামের উদ্যোগ: পড়ালেখা করে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হতে চেয়েছিলেন মনিরুল ইসলাম। ইউটিউব দেখে এবং কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে পেঁয়াজ চাষ শুরু করেন তিনি। ২০১৫ সালে মাত্র ১৬ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেন। লাভের মুখ দেখায় প্রতি বছর পেঁয়াজ চাষ বাড়িয়ে দেন তিনি। গত বছরে ৪০ বিঘা জমিতে হাইব্রিড পেঁয়াজের চাষ করেছেন।
পেঁয়াজ চাষের আগে বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে উচ্চ মূল্য মনিরুল ইসলামকে ভাবিয়ে তোলে। তাই পেঁয়াজ চাষের পাশাপাশি পরিকল্পনা করেন কিভাবে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা যায়। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও বিভিন্ন এলাকায় ছুটে গেছেন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা যায় তা জানার জন্য। এ বছর তিনি বড় পরিসরে পেঁয়াজের বীজ আবাদ করে স্থানীয় কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
মনিরুল ইসলাম জানান, ভালো মানের বীজ উৎপাদনের জন্য উন্নত জাতের পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ফসলকে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের আশা করছেন তিনি।
এই কৃষক জানান, জমিতে এই ফসল আবাদে বিঘা প্রতি তার খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বাম্পার ফলন পেলে প্রতিবিঘা থেকে তিন লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনার কথা জানান তিনি।
তার ভাষায়, “পেঁয়াজের বীজ চাষে শ্রম বেশি লাগে, কিন্তু ফলন ভালো হলে লাভও ভালো হয়। কৃষকরা যদি পরিকল্পিতভাবে এই চাষে এগিয়ে আসে, তাহলে এটি একটি সম্ভাবনাময় কৃষিখাতে পরিণত হতে পারে।”
স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব: বড় পরিসরে পেঁয়াজের বীজ চাষের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। জমি পরিচর্যা, সেচ, আগাছা পরিষ্কার এবং ফসল সংগ্রহের সময় বহু শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কুষ্টিয়া অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ ও পেঁয়াজের বীজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। সঠিক প্রশিক্ষণ ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন আরো বাড়তে পারে।
বর্তমানে মাঠজুড়ে সবুজ গাছ ও ফুলে ভরে উঠেছে মনিরুল ইসলামের পেঁয়াজের বীজের ক্ষেত। সময়মতো আবহাওয়া সহায়তা করলে এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শওকত হোসেন ভুইয়া বলেন, “ভালো মানের বীজ উৎপাদনের জন্য উন্নত জাতের পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ফসলকে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পেঁয়াজের বীজ চাষ করে বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব।”
তিনি বলেন, “জেলায় ৬২ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজের আবাদ হয়েছে। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছি।”